যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য আলোচনা গত শুক্রবার রাতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এবং অটোয়ার মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হয়েছে। তবে এই সংঘাতের প্রভাব কেবল দুই দেশের সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মেইন, ভার্মন্ট এবং মিশিগানের মতো অর্থনৈতিকভাবে কানাডার ওপর নির্ভরশীল মার্কিন সীমান্ত রাজ্যগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই তিন রাজ্যের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা এখন একবাক্যে এই বাণিজ্য যুদ্ধের অবসান চাইছেন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিসন গ্রিয়ার সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, কানাডার শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এই আলোচনা ভেস্তে গেছে। অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ সময়ে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিল যা ছিল অন্যায্য এবং অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক। পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারী ট্রাকের ওপর মার্কিন শুল্ক হার কমানোর বিষয়টি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ এবং মাঝারি ও ভারী ট্রাকের ক্ষেত্রে অটো-শুল্ক ছাড় না দেওয়ার বিষয়টিও এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ফলে গত ২২ আগস্ট থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডিয়ান পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০% শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর জবাবে কানাডাও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক্স এবং পাল্প ও কাগজের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মেইন অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স এবং ডেমোক্র্যাট সমর্থিত স্বতন্ত্র সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং উভয়েই এই শুল্ক নীতিকে ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সিনেটর কলিন্স মনে করেন, এই অনিশ্চয়তা মেইনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, সিনেটর কিং বিশেষ করে লবস্টার শিল্পের ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। মেইনের শরতের লবস্টারের প্রায় অর্ধেক কানাডায় প্রক্রিয়াকরণের জন্য পাঠানো হয়। কানাডা যদি ২৫% শুল্ক আরোপ করে এবং ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় সেই প্রক্রিয়াজাত পণ্য আমদানিতে শুল্ক বসায়, তবে এই খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়বে। কলিন্স এর আগে মাংস, ব্লুবেরি এবং আলু প্রক্রিয়াকরণে কানাডার ওপর নির্ভরশীলতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
ভার্মন্টের গভর্নর ফিল স্কট, যিনি একজন রিপাবলিকান হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের এই নীতির কঠোর সমালোচক, তার অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট। তিনি এই শাস্তিমূলক শুল্ককে সাধারণ মানুষের ওপর কর আরোপের সামিল বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি কৃষক এবং পরিবারগুলোর খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের মজবুত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ভার্মন্টের মোট রপ্তানির ৩১ শতাংশই ছিল কানাডায়, যা তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারের তুলনায় দ্বিগুণ।
মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এই বাণিজ্য যুদ্ধকে 'অন্ধভাবে ব্যবহৃত হাতুড়ির' সাথে তুলনা করেছেন। তার দাবি, এই বিশৃঙ্খল শুল্ক যুদ্ধের ফলে মিশিগানের ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মুদি দোকান ও পেট্রোল পাম্পের দাম বাড়ছে। অটোমোবাইল খাতের বড় কোম্পানিগুলোও চাপে রয়েছে। কানাডা ইতিমধ্যে স্টেলান্টিস এবং জেনারেল মোটরস-এর জন্য শুল্কমুক্ত আমদানি কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর বিপরীতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কানাডিয়ান যানবাহন, ট্রাক এবং যন্ত্রাংশের ওপর ২৫% থেকে বাড়িয়ে ৫০% শুল্ক আরোপ করা হবে।
গত দেড় বছর ধরে এই রাজ্যগুলোর নেতারা সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন, কিন্তু এখন তাদের সুর বদলেছে। তারা এখন সতর্ক করার পরিবর্তে এই বাণিজ্য যুদ্ধকে একটি বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবে দেখছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিকভাবে 'যুদ্ধের' পর্যায়ে তুলনা করেছেন। যদিও মার্কিন প্রশাসন তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু সীমান্ত রাজ্যগুলোর আর্তনাদ এখন হোয়াইট হাউসের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।




