চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথটি চালুর পর পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। বর্তমানে এই রুটে চার জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করছে এবং চলতি মাসেই আরও এক জোড়া ট্রেন যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার যাত্রী এই রেলপথে যাতায়াত করলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম ঝুঁকি। গত তিন বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই জনপ্রিয় রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে ১০১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার তথ্যমতে, তাদের আওতাধীন সব লাইনে মোট ১৯০ জন মারা গেলেও তার মধ্যে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ২৭ জন, ২০২৫ সালে ৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং। দোহাজারী-কক্সবাজার অংশের মোট ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান ও প্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে মাত্র ১৬টিতে। বাকি ৫৬টি ক্রসিং সম্পূর্ণ অরক্ষিত। কিছু স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও গেটম্যানের অনুপস্থিতিতে যানবাহন ও পথচারীদের ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, রাস্তার বাঁক বা গাছপালার কারণে অনেক সময় ট্রেন আসা টের পাওয়া যায় না, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, গত ২০ সেপ্টেম্বর সাতকানিয়ার কাটগড় মোড় এলাকায় একটি লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন, যদিও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এটিকে 'অবৈধ ক্রসিং' বলে দাবি করেছে। লোহাগাড়ার আধুনগর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের গেটে কোনো গেটম্যান নেই, সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে যে পথচারীরা নিজ দায়িত্বে পারাপার হবেন এবং রেল কর্তৃপক্ষ কোনো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী থাকবে না।
জীবনহানির পাশাপাশি চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছে যাত্রীদের জন্য বড় আতঙ্ক। গত দেড় বছরে পূর্বাঞ্চলীয় এই রুটে অন্তত ৫০ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যাতে আহত হয়েছেন ১৫ জন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি লুৎফুল কবির এই অনিরাপদ পরিবেশের সমালোচনা করে বলেন, গেটম্যানের অভাব এবং দুর্বৃত্তদের ঢিল ছোড়া বন্ধ করতে রেলওয়েকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মামুনুল ইসলাম মনে করেন, পথচারীরা সচেতন হলে ট্রেনে কাটা পড়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসবে। এছাড়া পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রোধে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রেলপথে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল।




