বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে, তিনি চরম দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ডাকনাম 'দুখু মিয়া' ছিল সেই চরম অভাবের প্রতীক। তবে বংশপরিচয়, লোকসংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে এই প্রচলিত বয়ানটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। নজরুলের পূর্বপুরুষেরা কোনো সাধারণ কৃষক পরিবার ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন একটি সম্ভ্রান্ত ও প্রশাসনিক মর্যাদাসম্পন্ন পরিবার। মোগল আমলে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের কারণে তারা 'কাজী' উপাধি লাভ করেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সম্রাট শাহ আলমের সময়ে তারা লাখেরাজ সম্পত্তির অধিকার লাভ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিহারের হাজিপুর থেকে বর্ধমানের চুরুলিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। সুতরাং, কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগতভাবে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসেননি, বরং তাঁর পরিবার ছিল এক ঐতিহ্যের অধিকারী, যারা সময়ের আবর্তে আর্থিক সমৃদ্ধি হারিয়েছিল।
নজরুলের ডাকনাম 'দুখু'র পেছনে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো পারিবারিক অভাব-অনটন। কিন্তু বাংলার লোকসংস্কৃতির গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে অন্য এক কারণ থাকতে পারে। তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, কোনো পরিবারে পরপর সন্তান মারা গেলে পরবর্তী সন্তানের নাম অবজ্ঞাসূচক বা অনাকর্ষণীয় রাখা হয়, যাতে অশুভ শক্তি বা কুদৃষ্টি থেকে তাকে রক্ষা করা যায়। নজরুলের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল; তাঁর পিতার ঘরে নজরুল জন্মানোর আগে চার পুত্র অকালমৃত্যু বরণ করেন। এই প্রেক্ষাপটে 'দুখু' নামটি দারিদ্র্যের দলিল নয়, বরং সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার এক মাতৃত্বসুলভ প্রচেষ্টা এবং লোকবিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল।
নজরুলের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর ভবঘুরে স্বভাবকে অনেকেই কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনার ফল হিসেবে দেখেন। তবে তাঁর পিতার জীবনধারা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কাজী ফকির আহমদ ছিলেন আধ্যাত্মিক প্রকৃতির মানুষ এবং পীরপুকুরের মাজারের খাদেম। তাঁর সংসার-বিমুখতা ও সুফিবাদী জীবনবোধের প্রভাব নজরুলের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। নজরুলের শৈশব কেবল অভাবের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন এক অনুসন্ধিৎসু প্রাণ। মসজিদের ইমামতি থেকে শুরু করে রামায়ণ-মহাভারত পাঠ এবং বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীর আশ্রমে যাওয়া—এই বহুমাত্রিকতা তাঁর সহজাত সৃজনী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিও তাঁর শৈশবের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে নিহিত ছিল। মসজিদ, মাজার, লেটোগান এবং হিন্দু পুরাণের সহাবস্থান তাঁকে এক উদার মনন তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, যার ফলে তিনি সমান দক্ষতায় হামদ-নাত এবং শ্যামাসংগীত বা কীর্তন রচনা করতে পেরেছেন। অনেকে মনে করেন অভাবের তাড়নায় তিনি লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন, তবে তাঁর সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল জীবিকার জন্য লড়াই করা কিশোর ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন বিরল প্রতিভাশালী অভিযাত্রী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের তুলনা করার সময় প্রায়শই জোড়াসাঁকোর ঐশ্বর্য বনাম চুরুলিয়ার দারিদ্র্যের বৈপরীত্য দেখানো হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, উভয় কবিই ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মেছিলেন—একজন জমিদার পরিবারে এবং অন্যজন কাজী পরিবারে। পার্থক্য ছিল কেবল অর্থনৈতিক স্থিতির সময়পর্বে। তাই নজরুলকে 'নিম্নবিত্তের কবি'র চেয়ে 'নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি' বলা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত, কারণ তিনি তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। পরিশেষে, নজরুলের শৈশবকে কেবল দারিদ্র্যের আখ্যান হিসেবে না দেখে, একে পারিবারিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং সুফিমানসের এক সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।


