বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্ব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা গণমানুষের আত্মত্যাগকে ঘিরেই আলোচিত হয়ে থাকে। তবে এই সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে—হাজার মাইল দূরে থেকে মানবতার দায়বোধ থেকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো বিদেশি লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও মানবতাবাদীদের অবদান। সাংবাদিক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইটি সেই তুলনামূলকভাবে অনালোচিত ইতিহাসকে নতুন আলোয় উপস্থাপন করেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি বাংলাদেশের একটি ‘ধন্যবাদপত্র’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তুলতে যাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের অবদান লেখক শুধু তথ্যের মাধ্যমে নয়, মানবিক অনুভূতির স্পর্শে ফুটিয়ে তুলেছেন। ফলে এটি নিছক ইতিহাসগ্রন্থ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সংহতির এক উজ্জ্বল স্মারক ও কৃতজ্ঞতার দলিল। মতিউর রহমানের অভিজ্ঞ সাংবাদিকতার ছাপ বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে স্পষ্ট—তথ্য সংগ্রহে সতর্কতা, ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যার দক্ষতা এবং ব্যক্তিদের ভূমিকা মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা পাঠকের আস্থা অর্জন করে।
বইটিতে স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষভাবে মনে দাগ কেটেছে আঁদ্রে মালরোর মানবতাবাদী সংহতি, জোয়ান বায়েজের প্রতিবাদী কণ্ঠে উচ্চারিত মানবাধিকারের দাবি, বব ডিলানের গানকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা এবং জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার প্রতি মানবিক উদ্যোগ। তাঁদের ভূমিকা ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য এক ছিল—বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ভাষার দিক থেকে মতিউর রহমানের গদ্য সহজ, প্রাঞ্জল ও সংযত। অপ্রয়োজনীয় আবেগ না থাকলেও বইটি শুষ্ক তথ্যের ভারেও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠেনি; বরং ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এতে সংযোজিত আলোকচিত্রমালা, যা শুধু লেখার অলংকার নয়—ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে পাঠককে সরাসরি ১৯৭১-এর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশেষ করে বিদেশি বন্ধুদের কার্যক্রম ও ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর ছবি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে।
‘ভালোবাসায় বাড়ানো হাত’ বইয়ের গভীর বার্তা তার শিরোনামেই নিহিত। এখানে ভালোবাসা ব্যক্তিগত আবেগ নয়, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি। লেখক দেখিয়েছেন, ভাষা, সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের মানবিক দায়িত্বকে থামাতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশি বন্ধুদের সহমর্মিতা তারই প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে, আন্তর্জাতিক সংহতির শক্তি বুঝতে কিংবা ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক গল্পগুলো আবিষ্কার করতে চাইলে বইটি অবশ্যপাঠ্য। বইটি শেষে পাঠক উপলব্ধি করেন, স্বাধীনতার ইতিহাসে যেমন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান চিরস্মরণীয়, তেমনি দূরদেশ থেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলোর প্রতিও আমাদের ঋণ অনন্ত।
উল্লেখ্য, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ইংরেজি বিভাগ, পরিবেশ ও উন্নয়ন অধ্যয়ন (ইডিএস) বিভাগ এবং মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম (এমএসজে) বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বইটি নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। গত ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেই আয়োজনের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এমএসজে বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা ফাইজা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।


