যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাতের মাঝে দক্ষিণ কোরিয়া এক জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে তেহরানের পক্ষ থেকে কড়া সতর্কবার্তা এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, উপসাগরীয় অঞ্চল বা হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশের সামরিক অংশগ্রহণকে ইরান 'আগ্রাসনকারীর সরাসরি সমর্থন' হিসেবে গণ্য করবে, যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের দীর্ঘ ৬৪ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ওয়াশিংটনের চাপ মেনে নিয়ে সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে এই বন্ধুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই মার্কিন হুমকির মুখে নতি স্বীকার করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। যদিও সিউল সরাসরি এই হুমকির জবাব দেয়নি, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। এই টানাপোড়েনের ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ (ইউএফএস)-এর মেয়াদ ১১ দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ট্রাম্পের মতে, এই মহড়াগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের প্রতি শত্রুতামূলক বার্তা পাঠায়। এছাড়া সেপ্টেম্বরের আরও একটি সামরিক মহড়া বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার কারণ হিসেবে ইরানের সাথে যুদ্ধের সামরিক সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন তবে জানান, এই বাতিলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে কোনো সংকেত দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে বিশ্বাসী এবং তিনি ট্রাম্পের সাথে গঠনমূলক আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে সিউলের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল সচল রাখতে তারা আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার পথ খুঁজছেন। এর মধ্যে সমুদ্র টহল বিমান, রসদ সরবরাহকারী নৌযান এবং মাইন অপসারণের সরঞ্জাম পাঠানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপগুলো যাতে দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে বাধা না দেয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির কিছু সদস্যও সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে। সাধারণ মানুষও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটে রয়েছে। তাদের অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আসে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং স্থানীয় মুদ্রা ‘ওন’-এর মান গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত জরুরি।

কোরিয়া যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সিউলের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় সিউল এখনো ২৯ হাজার মার্কিন সৈন্যের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। তবে সম্প্রতি সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং জর্জিয়ায় হুন্দাই কারখানায় দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠাতে হলে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন, যা বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক climate-এ পাওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এভাবে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে ইরানের হুমকি এবং ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সিউল এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে।