অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি ও বাণিজ্যের ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণার পরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ইসরায়েল। জবাবে পূর্ব জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায় তারা। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার থেকেও ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে অত্যন্ত বৈরী বলে বিবেচিত হচ্ছে।
পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে পশ্চিম তীরে অভিবাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো এবং রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। গত বছর প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টারের কাজ ছিল গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা ফেরানো ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করা। ইসরায়েলের এ পদক্ষেপগুলো থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাজ্যসহ আরও ১১টি দেশের সম্মিলিত উদ্যোগে তারা কতটা গভীর উদ্বিগ্ন।
পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিগুলোয় উৎপাদিত পণ্য ইসরায়েলের মোট রপ্তানির খুব বড় অংশ না হলেও এসব পণ্যকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স ও কানাডাও রয়েছে। বহু বছর ধরেই যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ বলে মনে করে আসছে, তবে এত দিন তারা সেখানে উৎপাদিত বা চাষ করা পণ্য নিষিদ্ধ করার পথে যায়নি। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এক রায়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতিসহ পুরো দখলদারত্ব বেআইনি ঘোষণা করে; যুক্তরাজ্য ওই রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এটির (দখলদারত্ব বেআইনি) প্রতিফলন থাকা উচিত। শুধু পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞাই নয়, বসতিগুলোয় নির্মাণকাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থায়নে সহায়তাকারী কোম্পানিগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এমন অস্ত্র বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যেগুলো দখলদারত্বকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। এসব পদক্ষেপ অনেকের কাছে ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর মনে হয়েছে।
এড মিলিব্যান্ড নিজে একজন গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি এবং সব সময় ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি অবিচল সমর্থন প্রকাশ করে এসেছেন। এরপরও তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের প্রায় সবার চেয়ে খোলাখুলি ও স্পষ্ট ভাষায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূলের জন্য এরাই দায়ী। আর ইসরায়েল সরকার এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে, এটা সত্যিই বিস্ময়কর।’
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির ওপর যুক্তরাজ্যের এ নিষেধাজ্ঞাকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে এক ‘নতুন শুরুর’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছেন মিলিব্যান্ড। যদিও গত সপ্তাহের ঘোষণাগুলো শুনে অনেকের কাছে মনে হয়েছে, এটি যেন তাদের নীতিতে একেবারে আমূল পরিবর্তন। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
অনেক ইসরায়েলিও মনে করেন, বসতি স্থাপনকারীদের কারও কারও সহিংস ও উগ্র মতাদর্শ ভীষণ উদ্বেগজনক; কেউ কেউ তাঁদের দেশের জন্য লজ্জার কারণ বলেও মনে করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূখণ্ডে গড়ে তোলা ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ মনে করেন। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট গত বছর তাঁর উত্তরসূরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে ‘আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে রাষ্ট্রে’ পরিণত করার অভিযোগ তুলেছিলেন। অধিকাংশ ইসরায়েলিই তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করলেও আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র নিন্দার চাপ যে ক্রমেই নেতানিয়াহুকে ঘিরে ফেলছে, তা তারা অনুভব করতে পারেন।
ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি লক্ষ্যপূরণের পথে দারুণ অগ্রগতি বলে মনে হচ্ছে। ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। লন্ডনে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট ব্রিটিশ সরকারের ওই সিদ্ধান্তকে ‘যুক্তরাজ্য ও ফিলিস্তিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ব্রিটেনের সাহসী পদক্ষেপগুলো ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পথ সুগম করতে সহায়তা করবে।’
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের ৫৯ বছরের দখলদারত্ব শেষ হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনো অত্যন্ত ক্ষীণ। ইসরায়েলের পশ্চিম তীর দখল করে নেওয়ার যে অনিবার্য প্রক্রিয়া চলছে, ১২টি দেশের সম্মিলিত পদক্ষেপে তা থামবে—এমন লক্ষণও এ পর্যন্ত খুব কম। এমন প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের আছে। ১৯৯১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক শামিরের সরকারের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের নিশ্চয়তা আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, কারণ শামির যুক্তরাষ্ট্রকে এ প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন যে তাঁর সরকার এ অর্থ দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের কাজে ব্যবহার করবে না। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা ঠেকানোর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে আগ্রহ দেখাননি।




