মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ আবারও রাস্তায় নেমে এসেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর বাসিন্দারাও এই মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছেন। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, গুয়াতেমালা এবং পর্তুগালে ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা ঘটেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময়ে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছিল, কিছুটা কমলেও বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনায় দাম আবার প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। জাকার্তার রাস্তায় তেল না পেয়ে অনেককে মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার গাড়ির নম্বর জোড়-বিজোড়ের ভিত্তিতে তেল দেওয়ার নিয়ম চালু করেছে, যার প্রতিবাদে গত সোমবার ট্যাক্সিচালকরা বিক্ষোভে অংশ নেন। জাভার জোগাকার্তাতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত—সেদিনই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে।
ফিলিপাইনের ম্যানিলা উপসাগরের জেলেরা ডিজেল বা গ্যাসচালিত নৌকা ব্যবহার করেন। বর্ষা শেষে এই সপ্তাহে তারা মাছ ধরায় ফেরার আশা করেছিলেন, কিন্তু জ্বালানির অতিরিক্ত দামের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। মৎস্যজীবীদের একটি সংগঠনের চেয়ারম্যান ফার্নান্দো হিকাপ জানান, জ্বালানির দামে তাদের 'দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার' অবস্থা হয়েছে।
সিরিয়ায় সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষের প্রতিবাদ শুরু হয়। গত রবি ও সোমবার দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে—বিভিন্ন শহরে যান চলাচল বন্ধ করে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কেউ নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন। তবে সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প ছিল না।
শ্রীলঙ্কায় প্রতি মাসে সরকার জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু বর্তমানে পেট্রলপাম্পে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ সীমিত করে দিয়েছে, কারণ সামনে দাম বাড়বে বলে তাদের আশঙ্কা। পেট্রলপাম্প মালিকদের সংগঠনের চেয়ারম্যান কুমারা রাজাপক্ষ সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, তারা লোকসানে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
গুয়াতেমালায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে লাতিন আমেরিকার কৃষকরাও ক্ষুব্ধ—ট্রাক্টর চালাতে তাদের ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। সম্প্রতি গুয়াতেমালা সিটিতে পরিবহনশ্রমিক ও আদিবাসী অধিকারকর্মীদের মিছিল দেখা গেছে। এর কয়েক দিন পর রাজধানীর দক্ষিণে ভিয়া নুয়েভা এলাকার ভিডিওতে রাস্তায় কয়েকটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
পর্তুগালে গত সপ্তাহে গাড়িচালকরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ধীরে গাড়ি চালিয়ে এবং হর্ন বাজিয়ে বিক্ষোভ করেন। রাজধানী লিসবনের '২৫ দে এপ্রিল' সেতুসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন মনে করেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যপন্থী সরকারগুলো এই সংকট থেকে মানুষকে রক্ষায় খুব বেশি কিছু করতে পারছে না। বেশির ভাগ জায়গায় বাস্তবসম্মত বিকল্পও নেই। ফলে জনতুষ্টিবাদ আরও জোরালো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।




