বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে চিহ্নিত করেছেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম। তার মতে, জ্বালানি সরবরাহ এখন আর কেবল গ্যাস বা বিদ্যুতের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে এক শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও, প্রকৃত চ্যালেঞ্জটি হলো এই সক্ষমতাকে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য উপায়ে কাজে লাগানো। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪৪ শতাংশ) গ্যাস এবং ২৩ শতাংশ ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের অবদান অত্যন্ত নগণ্য। এই অতি-নির্ভরশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে আসিফ ইব্রাহিম বেসরকারি খাতের বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল আহ্বানের বদলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দ্রুত অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে সরকারকে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে জমির স্বল্পতার কথা মাথায় রেখে বাণিজ্যিক ভবন, গুদাম ও কারখানার ছাদে 'রুফটপ সোলার' স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে জানান, রুফটপ সোলারের মাধ্যমে তারা মোট বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন।

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট মিটারড রুফটপ সোলার সিস্টেম থাকলেও এর মোট সক্ষমতা মাত্র ২১৪ মেগাওয়াট, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় খুবই সামান্য। এই খাতের প্রসারে তিনি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ওপর কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেন। এছাড়া, শত কোটি টাকার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ১০-১৫ বছরের পরিকল্পনা করেন, তাই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যনীতি এবং করকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

পরিশেষে, তিনি মনে করেন শিল্প খাতকে কেবল গ্রাহক হিসেবে না দেখে জ্বালানি সমাধানের অংশীদার হিসেবে গণ্য করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির বৈচিত্র্যকরণ এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি সরকারি অবকাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি মূলধন ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে তবেই আগামী ২০ বছরের জন্য একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটি নিশ্চিত হলে নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের পথ আরও প্রশস্ত হবে।