ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পশ্চিমবঙ্গ সফর চলাকালীন উচ্চপদস্থ মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিকল্পিতভাবে সরকারি কর্মসূচি থেকে দূরে রাখার অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র। এই বৈষম্যের কথা জানিয়ে তিনি জাতিসংঘের ‘স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার অন মাইনরিটি ইস্যুজ’-এর বিশেষ প্রতিনিধি অধ্যাপক নিকোলাস লেভরাটের কাছে একটি বিস্তারিত চিঠি লিখেছেন। তবে এই অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশ করায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিষ্ণুপুর থানায় সমন পাঠিয়ে তলব করা হয়েছে বলে মহুয়া মৈত্র নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন। যদিও এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ, গত জুলাই ও আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তিন দফা সফরের সময় নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্জিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার ওয়াকার রাজাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া স্পেশাল টাস্কফোর্সের মহানির্দেশক জাভেদ শামিমকে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি আইএএস অফিসার খলিল আহমেদকে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক চলাকালীন কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। মহুয়া মৈত্র একে ‘অর্থহীন সাম্প্রদায়িক আচরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই টুইটের প্রেক্ষিতে ডায়মন্ড হারবারে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়, যার ফলে সাইবার ক্রাইম পুলিশ তাঁকে তলব করে।

প্রশাসনিক চাপ এবং আইনি পদক্ষেপের মুখেও তিনি পিছু হটেননি। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ‘অফিস অব দ্য হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস’-এর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লেভরাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি জানান, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সহকর্মীরা যথাযথ মর্যাদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এই তিন কর্মকর্তাকে দূরে রাখা হয়েছে। মহুয়া মৈত্রের মতে, এই কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সরকারি প্রটোকল ও প্রশাসনিক কাজের জন্য অপরিহার্য ছিল। তিনি সতর্ক করেছেন যে, সরকারি স্তরে এমন বৈষম্য চললে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা নষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি এবং জাতিসংঘের ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের মৌলিক নীতিগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন। তাঁর মতে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশি ব্যবস্থার প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় এমন ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই তিনি জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছেন। চিঠিতে তিনি অনুরোধ করেছেন যেন ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তাকে ধর্মের ভিত্তিতে বাদ না দেওয়া হয় এবং নিরাপত্তা সংস্থায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া প্রমাণের স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সিসিটিভি ফুটেজ, ট্যুর ডায়েরি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি নথি অবিলম্বে সংরক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সবশেষে, নিজস্ব এখতিয়ার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেন।