তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন অপকর্ম এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আজ বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিক তৎকালীন সরকারের অনৈতিক কাজে সহায়তা করেছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এই আলোচনাটি উঠে আসে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রেক্ষিতে। আওয়ামী লীগ আমলের শতাধিক মানুষকে গুম ও হত্যার অভিযোগে এই মামলাটি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার উক্ত মামলায় ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী। সাক্ষীর এই জবানবন্দির পর চিফ প্রসিকিউটর গণমাধ্যমকে ব্রিফিং করেন।
সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী তাঁর জবানবন্দিতে ২০১২ সালের মার্চ মাসে সুন্দরবনের মরা ভোলা এলাকায় পরিচালিত একটি ত্রিমাত্রিক অভিযানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো বা 'স্টেইজড অপারেশন'। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযানের আগের রাতে র্যাব গোয়েন্দা দলের সদস্যরা এলাকাটি ঘিরে ফেলে এবং পরিকল্পিতভাবে গুলির শব্দ সৃষ্টি করা হয়, যার পর মূল দল গুলি শুরু করে। শেষ পর্যন্ত পাঁচটি মৃতদেহ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন এডিজি (অপস) কর্নেল মুজিব এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মোহাম্মদ সোহায়েলের উপস্থিতির কথা জানান তিনি।
সাক্ষী আরও জানান, সোহায়েলের আমন্ত্রণে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ট্রলারে করে আনা হতো এবং ফায়ারিং শেষে জিয়াউল আহসানের নির্দেশনায় তাঁদের ঘটনাস্থল দেখানো হতো। সাব্বির রহমান ওসমানীর মতে, বনদস্যুদের কাছে অটোমেটিক অস্ত্র থাকার কথা নয়, কিন্তু সেখানে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ শোনা গিয়েছিল। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই চলাফেরা করতেন, যা প্রমাণ করে এটি একটি সাজানো নাটক ছিল।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান সোহায়েল তাঁর পছন্দের কিছু সাংবাদিককে এই ধরনের অভিযানে নিয়ে যেতেন এবং তাঁদের যেভাবে ব্রিফ করা হতো, সংবাদমাধ্যমে সেভাবেই প্রচার করা হতো। প্রসিকিউটরের দাবি, যারা এই সাজানো ঘটনার বয়ান তৈরিতে সহায়তা করেছেন, তাঁরা সমানভাবে অপরাধী এবং তাঁদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। যদিও সাক্ষী নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ করেননি, তবে তৎকালীন ফুটেজগুলো সংগ্রহ করে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যে তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তার রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা মোজাম্মেল বাবু এবং সাবেক প্রতিবেদক ফারজানা রুপা। এছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের মামলাতেও মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে আসামি করা হয়েছে।




