১৯৬৮ সালে টেনিসের ওপেন যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউএস ওপেন ধীরে ধীরে দুই সপ্তাহের ক্রীড়া আসর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ইভেন্টে রূপ নিয়েছে। এখন শুধু শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়রাই নন, এই টুর্নামেন্টে ভিড় জমান তারকা, বিলাসবহুল ব্র্যান্ড, কর্পোরেট নির্বাহী এবং উচ্চ আয়ের দর্শকরা। এই মিশ্রণই কুইন্সের বার্ষিক এই আয়োজনকে অর্ধ-বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয়কারী ব্যবসায় পরিণত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস অ্যাসোসিয়েশন (ইউএসটিএ) ২০২৪ সালে মোট ৬২৩.৮ মিলিয়ন ডলার রাজস্বের কথা জানিয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ইউএস ওপেন থেকে। টুর্নামেন্টটি তার তিন সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে ৫৫৯.৬ মিলিয়ন ডলার পরিচালন আয় করেছে। তবে এই বিপুল অর্থ উপার্জনের জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগও প্রয়োজন। ২০২৪ সালে পরিচালন ব্যয় ছিল ২৮২.২ মিলিয়ন ডলার, ফলে প্রায় ২৭৭.৪ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত থেকেছে—যা প্রায় ৪৯ শতাংশ মার্জিন। ২০২৩ সালের ৫১৪.১ মিলিয়ন ডলার থেকে রাজস্ব ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা মহামারির পর থেকে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকা প্রবৃদ্ধির ধারাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে ইউএস ওপেন তার ক্রীড়া-কেন্দ্রিক পরিচয় থেকে কতটা দূরে সরে এসেছে। উইম্বলডন, দ্য মাস্টার্স এবং ফর্মুলা ওয়ানের পাশাপাশি এটি এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিলাসবহুল ক্রীড়া অভিজ্ঞতা এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অর্থ-উপার্জনকারী আসর। টুর্নামেন্টের আয়ের উৎসগুলো বৈচিত্র্যময়: টিকিট বিক্রি, স্পনসরশিপ, সম্প্রচার স্বত্ব, আতিথেয়তা প্যাকেজ, খাদ্য ও পানীয় এবং পণ্যদ্রব্য। ২০২৪ সালে টিকিট থেকে আয় হয়েছে ২০৮.৫ মিলিয়ন ডলার, স্পনসরশিপ থেকে ১৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি, কর্পোরেট আতিথেয়তা ও সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে ৮৩.৩ মিলিয়ন ডলার এবং সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন ডলার।

দর্শক সংখ্যাও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউএসটিএ-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আসরে ইউএসটিএ বিলি জিন কিং ন্যাশনাল টেনিস সেন্টারের গেট দিয়ে ১০.৪ লাখের বেশি দর্শক প্রবেশ করেছেন—এটি প্রথম ইউএস ওপেন যা ১০ লাখ দর্শকের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ১১.৪ লাখে পৌঁছেছে। তবে এই আর্থিক সাফল্যের পেছনে মূল চালিকা শক্তি হলো প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা এবং এক্সক্লুসিভিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কৌশল।

গত এক দশকে ইউএস ওপেন নিজেকে বিলাসবহুল ক্রীড়া ও বিনোদন গন্তব্য হিসেবে পুনঃস্থাপন করেছে। তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী টিকিট এখনো পাওয়া গেলেও টুর্নামেন্টটি প্রিমিয়াম আসন, আতিথেয়তা অফার, বিলাসবহুল স্যুট এবং উচ্চ ব্যয়কারী দর্শক ও কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের আকর্ষণ করার জন্য নানা এক্সক্লুসিভ সংযোজন নিয়ে আগ্রাসীভাবে সম্প্রসারণ করেছে। ইউএসটিএ এখন আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম এবং আশপাশের এলাকার উন্নয়নে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে—এটি টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মূলধন প্রকল্প। এই কাজের বেশিরভাগ অংশই প্রিমিয়াম আতিথেয়তা ও উচ্চমানের দর্শক অভিজ্ঞতার লক্ষ্যে নিবেদিত।

এই পরিবর্তন ক্রীড়া জগতের একটি বৃহত্তর প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে লিগ ও ইভেন্ট আয়োজকরা প্রিমিয়াম ইনভেন্টরিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে কারণ এটি প্রতি আসনে ঐতিহ্যবাহী টিকিট বিক্রির চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব তৈরি করে। স্পনসরদের জন্য আকর্ষণ সহজবোধ্য। প্রচলিত বিজ্ঞাপন প্রচারণার বিপরীতে ইউএস ওপেন ব্র্যান্ডগুলিকে একটি কেন্দ্রীভূত স্থানে উচ্চ আয়ের দর্শকদের সরাসরি প্রবেশাধিকার দেয়। ইভেন্টটি লাইভ স্পোর্টস, বিনোদন, আতিথেয়তা, ফ্যাশন এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিংকে একত্রিত করে, যা এটিকে ক্রীড়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্পনসরশিপ প্ল্যাটফর্মগুলির একটি করে তুলেছে।

২০২৪ সালে ইউএস ওপেন ২৭টি স্পনসরশিপ চুক্তি বজায় রেখেছিল, যার মধ্যে আমেরিকান এক্সপ্রেস, এমিরেটস, রোলেক্স, টিফানি অ্যান্ড কোং, রাল্ফ লরেন এবং গ্রে গুজের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই কোম্পানিগুলির অনেকের জন্য চুক্তিগুলো স্বল্পমেয়াদী বিক্রির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ব্র্যান্ড অবস্থানের বিষয়ে বেশি। ইউএস ওপেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া স্পনসরদের প্রতিপত্তি, এক্সক্লুসিভিটি এবং ধনী গ্রাহকদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে দেয়।

এই কৌশলের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো 'হানি ডিউস' ককটেল। গ্রে গুজ ভদকা, লেমোনেড, রাস্পবেরি লিকার এবং টেনিস বলের আদলে তৈরি মধুর তরমুজের বল সমন্বিত এই পানীয়টি টুর্নামেন্টের অন্যতম স্বীকৃত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ২৩ ডলার দাম হওয়া সত্ত্বেও এর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রে গুজ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৭,৩৮,৪৫৯টি হানি ডিউস বিক্রি হয়েছে, যা থেকে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে এক্সক্লুসিভ অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে গেলে ভোক্তারা কত সহজে প্রিমিয়াম মূল্য মেনে নেয়। রাল্ফ লরেনও টুর্নামেন্টের সঙ্গে তার বহু দশকের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে টেনিস সংস্কৃতি ও প্রিমিয়াম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছে। অফিসিয়াল ইউএস ওপেন সংগ্রহে শত ডলার মূল্যের পোশাক নিয়মিতভাবে দেখা যায়, যা ইভেন্টের সঙ্গে সমার্থক বিলাসবহুল অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—ইউএস ওপেন কি তার বিলাসবহুল মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে? সমালোচকরা যুক্তি দেন যে টিকিটের দাম, আতিথেয়তা প্যাকেজ এবং অন-সাইট ব্যয় ক্রমাগত বাড়ায় টুর্নামেন্টটি সাধারণ দর্শকদের জন্য ক্রমশ দুর্গম হয়ে উঠছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চাহিদা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি; বরং উপস্থিতির রেকর্ড, স্পনসরশিপের প্রবৃদ্ধি এবং প্রিমিয়াম আতিথেয়তা বিক্রি—সবই একই দিকে এগোচ্ছে। স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ আরও প্রিমিয়াম ইনভেন্টরি যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইউএসটিএ বিশ্বাস করে ভোক্তারা আরও বেশি এক্সক্লুসিভিটির জন্য অর্থ দিতে থাকবে। ইউএসটিএ-র প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা কার্স্টেন কোরিও কার্বেডকে বলেছেন, “তারা আসলে টেনিসে এতটা আগ্রহী নয়, বরং দৃশ্যপটে থাকতে এবং সেখানে উপস্থিত থাকতে চায়।”

ইভেন্টের অর্থনৈতিক প্রভাব মাঠের বাইরেও বিস্তৃত। বিশ্লেষণ সংস্থা গোস্টকমের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ইউএস ওপেন হোটেল, খাদ্য ও পানীয়, পোশাক, রেস্তোরাঁ এবং নাইটলাইফসহ বিভিন্ন খাতে ৩৬৯.৭ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ভোক্তা ব্যয় তৈরি করতে পারে। আপাতত ব্যবসায়িক যুক্তিটি স্পষ্ট: ইউএস ওপেন নিজেকে টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে একটি বিলাসবহুল বিনোদন ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেছে—যা বছরে অর্ধ-বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে এবং এক্সক্লুসিভিটি থেকে অর্থোপার্জনের নতুন উপায় খুঁজে চলেছে।