মধ্যপ্রাচ্যে কূটনীতি যখন প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ইরান ও তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে এক বিরল বৈঠক হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ পুনরায় চালু করার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশা জাগিয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান নিয়ে গঠিত জিসিসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আগামী সোমবার তেহরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। শুক্রবারই এই খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৯ শতাংশ পড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৫২ ডলারে নেমে এসেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই হবে প্রথম এমন সমাবেশ। একই সময়ে ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালীতে সাময়িকভাবে ট্রাফিক পরিচালনার জন্য যে চুক্তি তৈরি করছে, তার পক্ষে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা চালাচ্ছে দুটি দেশ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রণালীটি পুরোপুরি খুলে যাবে না। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জুন মাসে যুদ্ধবিরতির যে চুক্তি হয়েছিল, তার শর্তগুলো প্রথমে পূরণ করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছে, ইরান ও ওমান চায় জিসিসি সদস্যরা তাদের সমর্থন দিক, যাতে সেই সমর্থনকে পুঁজি করে ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া যায়। অন্যদিকে জিসিসি সদস্যরা নিশ্চিত করতে চায় যে, যা কিছু সম্মত হবে তা যেন অস্থায়ী হয় এবং তাদের জাহাজগুলো যেন নির্বিঘ্নে ওই পথে চলাচল করতে পারে। ইরানের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে জিসিসি রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত সতর্ক, তবে ইরান যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে, তখন এই সমীকরণ বদলাতে পারে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে ইরান-বহির্ভূত তেলের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিয়ে যাওয়ায় অঞ্চলটির রপ্তানি প্রাক-যুদ্ধ সময়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। এই প্রবাহ ইরানের রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দিলেও, নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টায় ইরান সম্প্রতি অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে নতুন করে মিসাইল হামলা চালিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা করেছে এবং ইয়েমেনে নিজেদের মিত্র হুথি বিদ্রোহীদের বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কাছে নতুন এলাকা দখলে সহায়তা করেছে। লোহিত সাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালীটি হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল। দেশটি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে উপসাগর থেকে তেল লোহিত সাগরে পাঠাচ্ছিল, তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথিরা সেই পাইপলাইন এবং সৌদি ট্যাংকারগুলোতেও হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের তেল রপ্তানির ওপর হুমকি থাকলেও সৌদি আরব নিজেদের মিত্রদের কাছ থেকে তেমন সমর্থন পাচ্ছে না। অ্যাক্সিওসের সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দুই দফায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার অনুরোধ জানান, কিন্তু ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন হুথিদের ওপর গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তুর ডেটা সরবরাহ করবে, তবে মার্কিন বাহিনী ইরান ও হরমুজ প্রণালীতেই মনোযোগী থাকবে এবং নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবে না।

সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানেরও প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, এবং পাকিস্তানি সেনারা সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান নিজেও হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরশীল বলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না। ইসলামাবাদ উদ্বিগ্ন যে, হুথি হামলা পাকিস্তানকে যুদ্ধে টেনে নিতে পারে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুথি হামলার কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে ফোনে সব সামরিক ফ্রন্টে উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দেন। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, সৌদি-হুথি সংঘাতে পাকিস্তান নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে, কারণ দেশটির নিজস্ব স্বার্থ বড় এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।