ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওমো ভ্যালিতে বসবাসকারী মুরসি নৃগোষ্ঠীর এক বিচ্ছিন্ন জনপদের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এক লেখক। হাজার বছর আগের জীবনধারা এখনো ধরে রাখা এই জনগোষ্ঠীর জীবন মূলত কৃষি, পশুপালন এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। লেখকের যাত্রা শুরু হয় জিনকা শহর থেকে, যেখানে গাইড মেলাকের সহায়তায় তিনি ল্যান্ড ক্রুজার জিপে করে মুরসিদের গ্রামের দিকে রওনা হন। ইথিওপিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তিনি একাই জিপ ভাড়া করেন।

মুরসিদের গ্রামে পৌঁছানোর পথটি পাহাড় এবং জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। পথে মাগো ন্যাশনাল পার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নানা রঙের বুনো ফুল এবং ২৩০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতিতে পরিবেশটি হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। তবে এই জঙ্গলে লেপার্ড, চিতা, হায়েনা এবং বুনো কুকুরের মতো হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব রয়েছে। গাইড মেলাকের তথ্যানুযায়ী, এই গ্রামের নারী-পুরুষেরা দুপুরের পর স্থানীয় মদিরা পানে মত্ত থাকেন, তাই তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে হলে খুব ভোরে পৌঁছাতে হয়।

মুরসি সমাজকাঠামোতে গ্রামপ্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তিনি গ্রামের সব ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নেন। এই সমাজের পুরুষেরা মূলত পশুপালন এবং কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন, তবে ঘরের যাবতীয় কাজ এবং সন্তান পালন করেন নারীরা। গ্রামপ্রধানের কাছে উপঢৌকন প্রদান করে এই জনপদে প্রবেশের নিয়ম। এখানে প্রথাগত অনেক অদ্ভুত রীতি প্রচলিত। যেমন, পুরুষের জন্য একাধিক বিয়ে স্বাভাবিক এবং পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি তাদের জন্য চরম আনন্দের বিষয়। তাদের নিজস্ব ধর্ম ও ঈশ্বর 'তুমউই', যিনি আকাশের অধিপতি বলে তারা বিশ্বাস করে।

মুরসি নারীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে তারা নিচের ঠোঁটে ছিদ্র করে মাটির তৈরি বড় চাকতি বসিয়ে রাখেন। এই প্রথার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সামনের নিচের দাঁত ফেলে দিতে হয়। যদিও প্রবীণ নারীদের মধ্যে এই রীতি প্রবল, তবে বর্তমান প্রজন্মের তরুণীরা যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই প্রথা থেকে দূরে সরে আসছে। এছাড়া তারা কানেও কাঠের চাকতি ব্যবহার করে, যা বয়সের সাথে সাথে আকারে বড় করা হয়। অনেকের মাথায় গরুর মাথার কঙ্কাল এবং বুনো ফল সাজানোর প্রবণতা দেখা যায়।

তাদের বসতবাড়ি বা 'দেবোয়তাস' অত্যন্ত সাধারণ। খড়, কাঠ এবং ডালপালা দিয়ে তৈরি গোলাকার এই ঘরগুলো দেখতে অনেকটা ইগলুর মতো। ভেতরে কোনো আধুনিক আসবাবপত্র নেই; শুধু চাটাই এবং চাদর বিছিয়ে তারা ঘুমান। রান্নার জন্য খোলা আকাশের নিচে পাথরে চুলা বানিয়ে ভুট্টা ও সোরগাম সেদ্ধ করা হয়। তাদের প্রধান খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভুট্টা ও সোরগাম এবং বুনো শাকসবজি। উৎসবের সময় তারা গরুর তাজা রক্ত ও দুধের মিশ্রণ পান করে।

এই বিচ্ছিন্ন জনপদে কোনো স্কুল, হাসপাতাল বা বিদ্যুৎ নেই। ভেষজ উপায়ে এবং জড়িবুটির মাধ্যমে তারা নিজেদের চিকিৎসা করে। সরকারি সহায়তা বা এনজিওর প্রবেশ নেই এই দুর্গম এলাকায়। তাদের জীবন এতটাই সরল যে আয়নার মতো সাধারণ জিনিসেরও প্রয়োজন বোধ করে না। তারা মাটি দিয়ে ছোট ছোট পশুপাখির পুতুল তৈরি করে, যা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে তারা কিছু অর্থ উপার্জন করে। লেখকের মতে, প্রকৃতির সাথে এমন নিবিড় সম্পর্ক এবং প্রাগৈতিহাসিক জীবনধারা আধুনিক শহরের মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।