ইরানের সাথে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সপ্তাহের শুরুতে দেশটির এবং তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে এক 'অর্থনৈতিক আক্রমণ'-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সপ্তাহের শেষ নাগাদ দেখা গেছে, তেহরানের সাথে সম্পর্ক রাখা দেশগুলো এই হুমকিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি এবং মার্কিন পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষকদের কাছে হতাশাজনক মনে হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ৯ শতাংশ তেল আমদানিকারক দেশ চীন ওয়াশিংটনকে নতি স্বীকার করার পরিবর্তে বরং পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, দুবাইয়ে ইরানি ব্যাংকগুলোর শাখা যথারীতি খোলা রয়েছে। আবুধাবির ব্যাংক মেলির এক কর্মচারী নিশ্চিত করেছেন যে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। এছাড়া তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ইরানের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল অব্যাহত রয়েছে, যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহে তেহরানের সাথে সমস্ত আর্থিক লেনদেন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একইসাথে রাশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড এবং আজারবাইজানগামী বিমান রুটগুলোও অপরিবর্তিত রয়েছে। সপ্তাহের শেষে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক মিশরের 'ব্যাঙ্ক মিসর'-এর শাখাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। অথচ বেসেন্ট দাবি করেছিলেন, সপ্তাহের শেষ নাগাদ কোনো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হবে। ফলে প্রকৃত পদক্ষেপ এবং পূর্ব ঘোষণা বা 'হাইপ'-এর মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন প্রাক্তন ট্রেজারি কর্মকর্তা এবং ক্যাপিটল পিক স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স জার্ডেন। তিনি উল্লেখ করেন, 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট' মূলত ইরানের বিরুদ্ধে গত ৪৭ বছরের সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই ধারাবাহিকতা, যা বর্তমান যুদ্ধে কোনো পরিষ্কার সামরিক বা অর্থনৈতিক জয়ের পথ দেখায় না।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত প্রভাব ফেলতে হলে চীনকে লক্ষ্যবস্তু করতে হবে, কিন্তু তেমন পদক্ষেপ নিলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং চীনের তীব্র প্রতিশোধের ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে, ছোটখাটো নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়ালেও তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আনবে না। এছাড়া বেসেন্টের এই পদক্ষেপকে ১৯৪৪ সালের ঐতিহাসিক 'ডি-ডে' অভিযানের সাথে তুলনা করা হলেও, বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। ডি-ডে ছিল একটি সমন্বিত আক্রমণ, কিন্তু বর্তমান মার্কিন পদক্ষেপ সম্পূর্ণ একতরফা, যেখানে মিত্রদের সাথে কাজ করার চেয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা বেশি। বেসেন্ট নিজেও স্বীকার করেছেন যে, খুব দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ নিলে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন 'গোপন কূটনীতি'র আশ্রয় নিচ্ছে এবং যুক্তরাজ্যের কাছে সমর্থনের অনুরোধ জানিয়েছে। উত্তর ক্যারোলাইনার অ্যাশভিলের জি২০ সম্মেলনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির সাথে অন্যান্য অর্থমন্ত্রীদের আলোচনার কথা রয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান জশ লিপস্কি মনে করেন, সেখানে মূল প্রশ্নটি হবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে প্রস্তুত কি না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তকে 'সার্বভৌম সিদ্ধান্ত' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা তাদের জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানি বিষয়ে অন্য দেশগুলোর সাথে আলোচনার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করছেন, তখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন চীনকে উপেক্ষা করে কার্যকর অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানো অসম্ভব। ইতোমধ্যে ইরানের বন্দরগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের মুখে তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তুরস্কের মতো দেশগুলো এখনো মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পায়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানও এই একতরফা নিষেধাজ্ঞার কথা মানতে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরবি। পাকিস্তানের সাথে ইরানের চাল ও আমসহ স্থল বাণিজ্য এখনো অব্যাহত রয়েছে। ডিবিএম কনসাল্টিং-এর প্রধান উপদেষ্টা স্টিফেন ফ্যালন মনে করেন, ইরানের মতো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করা অসম্ভব, কারণ এতে জড়িত অনেক দেশেরই বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে।




