ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের পকেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারে গড়ে প্রায় ২,০০০ ডলারের বাড়তি খরচ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১,১০০ ডলার ব্যয় হয়েছে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে, আর বাকি অংশটি উচ্চ সুদের হার এবং সামরিক খাতের ব্যয়ের ফলে এসেছে। সামগ্রিকভাবে পুরো দেশজুড়ে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৫ বিলিয়ন ডলারে।
পেন্টাগনের তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পর্যন্ত ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। জুলাই মাসে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের যে প্রাক্কলন করেছিলেন, তা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে এই ব্যয়। এই বিশাল অংকের অর্থের মধ্যে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ঘোষণা করেছিলেন যে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের ওপর কোনো হামলা চালানো হবে না। তবে নির্বাচনের ঠিক আগের দিন, ২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল একটি রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ। তবে এই ধরনের ছোট আকারের 'প্রতিরক্ষামূলক হামলা' গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গোপনেই চালানো হচ্ছিল, যাতে বড় ধরনের যুদ্ধের সংকেত না যায়।
এই সামরিক তৎপরতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এমআইটি স্লোন স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টের ভিজিটিং প্রফেসর গিলবার্ট মেটক্যাল্ফ সতর্ক করেছেন যে, শীতকালীন হিটিং সিজনে এই সংঘাত তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা বা জ্বালানি পরিকাঠামোতে ইরানি হামলার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো, যা এখন সংঘাতের কারণে অনিশ্চিত।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আঞ্চলিক যুদ্ধে সৌদি আরবের তেল পাইপলাইনসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি এবং জুন মাসে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেঙে যায় এবং আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ শেষ হয়। বর্তমানে এই সংঘাতকে একটি 'ক্ষয় যুদ্ধের' (war of attrition) রূপ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
এদিকে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউস ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর জ্বালানি বাজারে সাময়িক স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে কূটনৈতিক সমাধান আসতে পারে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ শতাংশের বেশি কমেছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মনে করেন, যুদ্ধের প্রভাবই নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ। তবে বিশেষজ্ঞ মেটক্যাল্ফের মতে, এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের পর ইরানের ওপর সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীরা মার্কিন ও ইরানি উভয় পক্ষের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।




