কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর সব প্রাণের গঠন একটি নির্দিষ্ট জৈব রাসায়নিক কাঠামো অনুসরণ করে আসছে। প্রতিটি জীবকোষে প্রোটিন সংশ্লেষণের জন্য মাত্র ২০টি প্রাকৃতিক অ্যামিনো অ্যাসিড ও ৬৪টি জেনেটিক কোডন ব্যবহৃত হয়। এই ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডকে জীবনের বর্ণমালা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত প্রোটিনের গঠন তৈরি হয়। কোষের মধ্যে প্রোটিন তৈরির মূল কারখানা হলো রাইবোজোম, যা সৃষ্টির শুরু থেকে অত্যন্ত রক্ষণশীল নিয়ম মেনে চলে। এতদিন ধারণা করা হতো, রাইবোজোম শুধু সেই টি-আরএনএ অণুগুলোই গ্রহণ করে যাদের শেষে 3' CCA নামে একটি নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স থাকে, যা কোষের ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করে। অন্য কোনো সিকোয়েন্স থাকলে তা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বাতিল হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই সীমানা অতিক্রম করে নতুন অক্ষর যোগ করে কৃত্রিম প্রোটিন তৈরির স্বপ্ন দেখছিলেন, কিন্তু জীবন্ত কোষে জিনোমের বড় পরিবর্তন করলে কোষ সাধারণত মারা যায়—এই বাধাই ছিল প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও উইস ইনস্টিটিউটের গবেষকদল এই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। বিখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ জর্জ চার্চ এবং প্রধান গবেষক ফেলিক্স র‍্যাডফোর্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল গত ২৬ আগস্ট নেচার বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা তাঁদের পরীক্ষার জন্য ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে বেছে নেন এবং এজেন্টেক্স (AGENTEX) নামে একটি অটোমেটেড রোবটিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। রাইবোজোমের মূল কাঠামোতে সূক্ষ্ম আণবিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁরা রাইবোজোমাল আরএনএর নির্দিষ্ট স্থানে ‘জি২২৫১সি’ এবং ‘জি২৫৫৩সি’ নামের দুটি মিউটেশন ঘটান। এই পরিবর্তনের ফলে রাইবোজোম তার চেনা নিয়ম ভেঙে বিকল্প সিজিএ (সাইটোসিন, গুয়ানিন, অ্যাডেনিন) প্রান্তযুক্ত non-CCA-3 টি-আরএনএ গ্রহণ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, এতদিন যে উপাদানগুলো ত্রুটিপূর্ণ বলে বাতিল করা হতো, সেই উপাদানগুলো এখন কোষের কাছে সম্পূর্ণ কার্যকর হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কোষের অন্যান্য প্রোটিনের সাথে এই পরিবর্তনের অভিযোজন ক্ষমতা। প্রোটিন তৈরিতে রাইবোজোম একা কাজ করে না; এর সাথে কোষের বিভিন্ন এনজাইমও যুক্ত থাকে। নতুন আচরণের সাথে তাল মিলিয়ে কোষের স্বাভাবিক এনজাইমগুলোও নিজেদের কাজের ধরন বদলে নেয় এবং কোনো বাধা ছাড়াই নতুন নিয়মের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। পরিবর্তিত টি-আরএনএগুলোও সফলভাবে অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে পরিপূর্ণ হতে সক্ষম হয়। এই নিখুঁত সমন্বয় প্রমাণ করে যে কোষের ভেতরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পুরো একটি নতুন জৈবিক ইকোসিস্টেম তৈরি করা সম্ভব।

এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জীবনের আদিম জিন কোডকে নতুন করে সাজিয়েছেন। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ৬৪টি কোডন মিলে ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হয়, যেখানে একাধিক কোডন একই অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে। কিন্তু এজেন্টেক্স প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে তাঁরা এই জটিল কোডকে সংকুচিত করে ২০টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ২০টি কোডন বরাদ্দ করেন। ফলে বাকি ১৪টি কোডন সম্পূর্ণ নতুন বা নন-স্ট্যান্ডার্ড অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত করার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্রকৃতির ২০ অক্ষরের বর্ণমালা রাতারাতি ৩৪ কোডনের একটি অত্যাধুনিক সিস্টেমে রূপান্তরিত হলো। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম অ্যামিনো অ্যাসিডকে প্রোটিনের গঠনে সফলভাবে যুক্ত করেছেন, যা প্রমাণ করে ল্যাবরেটরিতে কাস্টম প্রোটিন ডিজাইন এখন বাস্তবতা।

নেচারে প্রকাশিত এই গবেষণার প্রভাব মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। সম্পূর্ণ কোষবিহীন বা সেল-ফ্রি ব্যবস্থায় পরিচালিত এই প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কোষের বাইরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রোটিন তৈরি করার ফলে বিজ্ঞানীরা এখন যেকোনো কল্পনীয় প্রোটিন কাঠামো তৈরি করতে পারবেন, যার সাহায্যে নতুন ধরনের রাসায়নিক গঠন ও জৈব পলিমার তৈরি সম্ভব হবে। এটি প্লাস্টিক দূষণ রোধ বা টেকসই উপকরণ তৈরিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই কৃত্রিম উপাদানগুলো কেবল ল্যাবরেটরির কোষবিহীন পরিবেশেই কার্যকর, তাই সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে এগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর থাকে—ফলে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

গবেষণার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হলো এর চিকিৎসাসম্ভাবনা। প্রচলিত কেমোথেরাপি ক্যানসার কোষের পাশাপাশি সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে, কিন্তু কাস্টম-ডিজাইন করা কৃত্রিম প্রোটিনগুলো ক্যানসার বা দূরারোগ্য ব্যাধির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার নতুন যুগের সূচনা করবে। বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতে এমন ‘স্মার্ট প্রোটিন’ ডিজাইন করতে পারবেন যা শরীরে প্রবেশ করে জিপিএস ট্র্যাকারের মতো নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করবে এবং সুস্থ কোষগুলোকে অক্ষত রাখবে। জীবনের আদিম রহস্য খোঁজার পাশাপাশি বিজ্ঞান এখন নিজের হাতেই জীবনের উন্নত রূপরেখা আঁকতে শুরু করেছে, যা মানবজাতিকে রোগমুক্ত দীর্ঘায়ুর পথে নিয়ে যেতে পারে।