রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ২০২০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমানো ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স এখন আবার ব্রিটেনে ফিরছেন। তাঁদের দুই সন্তান—সাত বছরের আর্চি ও পাঁচ বছরের লিলিবেট—ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। আগামী মাসে পাঠদান শুরুর সঙ্গে মিল রেখে এই দম্পতি সেখানে দীর্ঘ সময় কাটাবেন বলে জানা গেছে। যদিও এটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, তবুও আটলান্টিকের দুই পারে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ছয় বছর আগে রাজপরিবারের সঙ্গে বিরোধের পর নিজ উদ্যোগেই ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গিয়েছিলেন হ্যারি ও মেগান। মেগান অবশ্য লস অ্যাঞ্জেলেসেই বড় হয়েছেন এবং একসময় সেখানে অভিনয়ও করেছেন। মন্টেসিটোর বিশাল বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নময় জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, হলিউডের বিনোদনজগতে তাঁদের সাফল্যের স্বপ্ন কেন পূরণ হলো না।

শুরুটা ছিল অনেক আশাব্যঞ্জক। ২০২০ সালে হলিউডে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে কয়েক কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেন এই দম্পতি। অনুপ্রেরণামূলক অনুষ্ঠান ও তথ্যচিত্র তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা। দুই বছর পর মুক্তি পাওয়া ছয় পর্বের তথ্যচিত্র ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’ প্রথম চার দিনে ২ কোটি ৩৪ লাখবার দেখা হয়, যা নেটফ্লিক্সে কোনো তথ্যচিত্রের জন্য রেকর্ড। মোট দেখা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি বার। কিন্তু এরপর আর কোনো অনুষ্ঠান সেই সাফল্যের ধারেকাছে যেতে পারেনি। ‘লিভ টু লিড’ কিংবা ‘পোলো’—কোনোটিই দর্শকদের মন জয় করতে পারেনি। ফলে ২০২৫ সালে নেটফ্লিক্স সামগ্রিক চুক্তিটি নবায়ন করেনি।

বর্তমানে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে একটি নতুন, অনেক কম সুবিধার চুক্তি রয়েছে। এর অধীনে কোনো অনুষ্ঠান তৈরি হলে এবং নেটফ্লিক্স তা প্রচারে আগ্রহ দেখালেই কেবল অর্থ পাবেন তাঁরা। তবু হলিউডের রলি স্টুডিওসে তাঁদের প্রতিষ্ঠান আর্চওয়েল প্রোডাকশনসের কার্যালয়ের ভাড়া এখনো বহন করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি মেগানের নতুন জীবনযাপনভিত্তিক ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’ নিয়ে একটি যৌথ উদ্যোগও ছিল। ‘উইথ লাভ, মেগান’ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ২৮ ডলারের কমলালেবুর ফুলের মধু ও ১৪ ডলারের এপ্রিকট জ্যামের মতো পণ্য বাজারে আনা হয়। কিন্তু অনুষ্ঠানটি প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। প্রথম কিস্তি ৬১ লাখ, দ্বিতীয় কিস্তি ২৩ লাখ ও বড়দিনের বিশেষ পর্ব ২৬ লাখবার দেখা হয়েছে। এরপর নেটফ্লিক্স নতুন পর্ব নির্মাণের অনুমোদন দেয়নি। গত মার্চে যৌথ উদ্যোগও শেষ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এখন সব পণ্য মেগানের নিজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে; ওয়েবসাইটে ১২ ডলারের ব্ল্যাকবেরি জ্যাম এখনো পাওয়া যাচ্ছে।

পডকাস্ট জগতেও যাত্রা সফল হয়নি। ২০২০ সালে স্পটিফাইয়ের সঙ্গে ২ কোটি ডলারের চুক্তি করেন তাঁরা। কিন্তু তিন বছরের মেয়াদে মাত্র একটি কিস্তি তৈরি হয়—‘আর্কিটাইপস’। মেগান উপস্থাপনা করলেও সেরেনা উইলিয়ামস ও প্যারিস হিলটনের মতো অতিথি নিয়ে তৈরি এই পডকাস্টের বাইরে হ্যারি কোনো অনুষ্ঠান তৈরি করেননি। এক বছর ধরে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে কাজ করলেও—যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় হ্যারির হট চকলেটের স্বাদ পরীক্ষা করার মতো প্রস্তাবও ছিল—কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তির পূর্ণ অর্থ পেয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। স্পটিফাইয়ের নির্বাহী বিল সিমন্স ২০২৩ সালে চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর একটি পডকাস্টে অশালীন শব্দ ব্যবহার করে হ্যারি ও মেগানকে ‘প্রতারক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

এই ব্যর্থতার পেছনে কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের সংস্কৃতিবিষয়ক ইতিহাসবিদ লিও ব্রাউডি বলেন, বিনোদনজগতে সাফল্যের কোনো সহজ পথ নেই। সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা প্রায়ই ভুল করে ভাবেন যে অন্য ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্য এখানেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে। কিন্তু হলিউডে ব্যর্থ কাজের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণই হলো এখানে সফল হওয়া কঠিন। ইউনাইটেড ট্যালেন্ট এজেন্সির তৎকালীন প্রধান জেরেমি জিমার ২০২৩ সালে সেমাফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরও কড়া ভাষায় বলেন, শুধু বিখ্যাত হলেই কেউ কোনো কাজে ভালো হবেন, এমন নয়। মেগান অডিওর জন্য খুব ভালো প্রতিভা নন; অন্য কোনো ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ প্রতিভা আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তবে সব প্রকল্পই ব্যর্থ হয়নি। মেগানের নির্বাহী প্রযোজনায় তৈরি ‘কুকি কুইনস’—গার্ল স্কাউট সদস্যদের বিস্কুট বিক্রির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তথ্যচিত্র—প্রেক্ষাগৃহে খুব বড় সাফল্য পায়নি। এমনকি ইন্টারনেটের সেরা বিড়ালের ভিডিও নিয়ে তৈরি ‘ক্যাটভিডিওফেস্ট ২০২৬’ ছবিটিও এর চেয়ে বেশি আয় করেছে। তবু ৪৪৬টি পর্দায় মুক্তি পেয়ে ছবিটির বক্স অফিস আয় প্রায় ১০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ভাড়ার বিনিময়ে এটি দেখা যাবে। পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান রোডসাইড অ্যাট্রাকশনসের হাওয়ার্ড কোহেন মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এটি সফল হবে। সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসব, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ওহাইও শহরে মেগানের উপস্থিতি ছবিটির আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে।

ভবিষ্যতের প্রকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে। আগামী বসন্তে অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পেতে পারে ‘ক্লোজ পারসোনাল ফ্রেন্ডস’; সান্তা বারবারার পটভূমিতে তৈরি ছবিটিতে ব্রি লারসন ও লিলি কলিন্সের সঙ্গে অতিথি চরিত্রে মেগানকে দেখা যাবে। নেটফ্লিক্সের অপরাধবিষয়ক ধারাবাহিক ‘দ্য জেন্টলমেন’–এর তৃতীয় কিস্তিতেও তাঁর অভিনয়ের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। চুক্তি হলে ব্রিটেনে ওই চরিত্রের চিত্রায়ণ হবে। তবে ধারাবাহিকটির দ্বিতীয় কিস্তি এখনো প্রচারিত হয়নি এবং তৃতীয় কিস্তির অনুমোদনও মেলেনি।

ব্রিটেনে ফেরার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে পরাজিত রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা স্পেনসার প্র্যাট। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যের বিনোদন ব্যবসা এখন দ্রুত বাড়ছে। সেখানে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নির্মাণের জন্য করসুবিধাও ক্যালিফোর্নিয়ার চেয়ে উদার। হ্যারি ও মেগান তাঁদের ‘প্রাসাদ ও দুর্গ’ চিত্রায়ণের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। ব্যবসায়িক দিক থেকে ইংল্যান্ডে বসে নেটফ্লিক্স বা প্যারামাউন্ট প্লাসের জন্য অনুষ্ঠান তৈরির সম্ভাবনাও বেশি।

অন্যদিকে, হ্যারি ও মেগানের একজন প্রতিনিধি তাঁদের ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়ার সিদ্ধান্তকে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, গ্রীষ্মে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর শরৎকালে দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে থাকবেন তাঁরা। সন্তানরা সেখানে আরও বেশি সময় কাটাতে পারবে বলে আনন্দিত দম্পতি। তাঁদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আগের মতোই চলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হচ্ছে না—কারণ মন্টেসিটোর ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার দামের বাড়িটি তাঁরা রেখে দিচ্ছেন। ২০২৩ সালে উইন্ডসর ক্যাসল প্রাঙ্গণের সরকারি বাসভবন ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল বলে সে সময় জানিয়েছিলেন তাঁদের প্রেস সচিব। ব্রিটেনে ফিরে নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করবেন কি না বা কোথায় থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সেখানে সরকারি নিরাপত্তা পাবেন কি না—সেটিও অনিশ্চিত।