আল্লাহর ঘর জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে এই পবিত্র যাত্রায় যদি কারো মৃত্যু ঘটে, তবে ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী তার জন্য রয়েছে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সুসংবাদ এবং পরকালীন বিশেষ মর্যাদা। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের আল্লাহর মেহমান হিসেবে গণ্য করা হয়। রাসুল (সা.) উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর মেহমান মূলত তিন শ্রেণির—আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী, হজ পালনকারী এবং ওমরাহ পালনকারী। একজন মেহমান যেমন উত্তম আতিথেয়তার প্রত্যাশা করেন, তেমনি আল্লাহর ঘরের জিয়ারতে আসা বান্দাও তাঁর ক্ষমা ও বিশেষ অনুগ্রহের আশা নিয়ে এই সফর করেন।

সাধারণত মানুষ জাগতিক অর্জন দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করলেও মুমিনের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতার ওপর। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১০০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে নিজ ঘর থেকে হিজরত করে বের হয় এবং পথেই তার মৃত্যু ঘটে, তবে আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান অবধারিত। যদিও এই আয়াতটি হিজরতকারীদের বিষয়ে নাজিল হয়েছিল, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যেকোনো নেক কাজের পথে বেরিয়ে মৃত্যুবরণকারীর ক্ষেত্রেও এই প্রতিদানের আশা রয়েছে।

ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির অনন্য মর্যাদার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সহিহ বুখারি-র ১২৬৫ নম্বর হাদিসে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, আরাফার মাঠে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে অবস্থানরত এক ব্যক্তি হঠাৎ বাহন থেকে পড়ে মারা যান। তখন নবীজি (সা.) তাঁর গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেও স্পষ্টভাবে বলে দেন যে, ওই ব্যক্তির মাথায় কাপড় দেওয়া যাবে না এবং তাঁকে সুগন্ধি লাগানো যাবে না। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি তালবিয়া পাঠরত অবস্থাতেই পুনরুত্থিত হবেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইবাদতের সময়কার বিশেষ অবস্থা মৃত্যুর পরেও বজায় থাকে এবং তা পরকালে বিশেষ সম্মানের কারণ হয়।

গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যারা এই সফরে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের নেক নিয়তের প্রতিদান সম্পর্কেও হাদিসে সুসংবাদ রয়েছে। বাইহাকির 'শুআবুল ইমান' (হাদিস: ৪১০০) অনুযায়ী, যে ব্যক্তি হজ, ওমরাহ বা জিহাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পথে মারা যান, আল্লাহ-তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য গাজি, হাজি ও ওমরাহ পালনকারীর সওয়াব লিখে রাখেন। অর্থাৎ আল্লাহ বান্দার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও নিয়তকে মূল্যায়ন করেন এবং তা নষ্ট হতে দেন না।

হজ ও ওমরাহর মূল উদ্দেশ্য কেবল নির্দিষ্ট স্থানে ভ্রমণ নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং পূর্ণ আনুগত্যের একটি অনুশীলন। ইহরামের সাদা পোশাক মানুষকে দুনিয়ার জৌলুস ও পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর সামনে সমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই সফরে মৃত্যু আমাদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা যে, মৃত্যু অনিশ্চিত, তাই নেক কাজের ইচ্ছা পোষণ করে যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে এই ইবাদতের জন্য শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি সঠিক জ্ঞান এবং আন্তরিক নিয়তের সমন্বয় থাকা জরুরি। যেহেতু দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতের জীবনই চিরস্থায়ী, তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে বিদায় নেওয়াই হওয়া উচিত প্রতিটি মুমিনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা।