বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হবু জীবনসঙ্গীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা জানা থাকা কি মৌলিক অধিকার, নাকি তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়? এই প্রশ্নটি যখন সামনে আসে, তখন ব্যক্তির তথ্যের গোপনীয়তা এবং অপরপক্ষের জীবন ও ভবিষ্যতের ঝুঁকির মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বংশগত রোগ, সংক্রামক ব্যাধি, গুরুতর মানসিক সমস্যা কিংবা প্রজননক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো বৈবাহিক জীবনের মান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই যেসব অসুস্থতা দাম্পত্য জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে বা সংক্রামক ক্ষতির সম্ভাবনা রাখে, তা প্রকাশ করা কেবল নৈতিক নয়, বরং বাধ্যতামূলক। এই ধরনের তথ্য গোপন করে বিয়ে করা স্পষ্টত প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামি শরিয়তে বিবাহকে একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হয়, যার মূল ভিত্তি হলো উভয় পক্ষের সচেতন ও স্বচ্ছ সম্মতি। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ২১ নম্বর আয়াতে এই অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। কোনো মৌলিক সত্য গোপন করে নেওয়া সম্মতি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে এই দলের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর মতে, যে ত্রুটি বা ব্যাধি অপর পক্ষকে মানসিকভাবে দূরে সরিয়ে দেয় বা বিবাহের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে, তা প্রকাশ করা আবশ্যক। তবে সামান্য বা সাময়িক অসুস্থতা, যা দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলে না, তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আওতায় রাখা যেতে পারে।
তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, রোগের বর্তমান প্রকৃত অবস্থা ও ডায়াগনসিস নিশ্চিত কি না। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে অপর পক্ষের শরীরে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর বা গর্ভধারণে মারাত্মক ঝুঁকি আছে কি না। তৃতীয়ত, এটি যৌন সক্ষমতা, প্রজনন বা স্বাভাবিক গৃহস্থালি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে কি না। চতুর্থত, ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে কি না। পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বা ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন আছে কি না, যা জানলে অপর পক্ষ সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতেন। এই পাঁচটি প্রশ্নের যেকোনো একটির উত্তর 'হ্যাঁ' হলে সেই তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অনেক পুরনো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এসেছে। যেমন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত ওষুধের মাধ্যমে ভাইরাস অশনাক্তযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনলে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও বিশেষ পরিকল্পনার প্রয়োজন থাকায় এই তথ্য জানানো জরুরি। একইভাবে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’-র ক্ষেত্রে বর্তমান প্রতিষেধক ও ওষুধের কার্যকারিতা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নকেই চূড়ান্ত ধরা হবে।
অনেকে মনে করেন সরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেই যথেষ্ট, কিন্তু স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে সাধারণত থ্যালাসেমিয়ার মতো নির্দিষ্ট কিছু বংশগত রক্তরোগ এবং এইচআইভি বা হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক ব্যাধির পরীক্ষা করা হয়। এর বাইরে থাকা গুরুতর অসুস্থতা নিজ দায়িত্বে জানানো নৈতিক কর্তব্য। জিনগত বাহক হওয়ার ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞ জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা প্রয়োজন; তবে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা যা পারিবারিক জীবন ব্যাহত করে, তা জানানো উচিত। তবে গোপনীয়তা রক্ষার নামে কাউকে হেয় করা ধর্মীয় নীতির পরিপন্থী।
তথ্য প্রকাশের সঠিক সময় হলো বিয়ের চুক্তি বা আকদের আগে, যখন সম্পর্কটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোয়। এটি সরাসরি হবু সঙ্গীর কাছে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের উপস্থিতিতে করা উচিত। অন্যদিকে, চিকিৎসকদের পেশাগত নীতি অনুযায়ী রোগীর অনুমতি ছাড়া তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ, তবে জনস্বার্থে বা অপর ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলে ডাক্তার তা বিবেচনা করতে পারেন। যদি বিবাহের পর জানা যায় যে কোনো পক্ষ গুরুতর ব্যাধি জেনেবুঝে গোপন করেছে, তবে তা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আদালতে বিবাহ বাতিলের আবেদন করার অধিকার রাখেন। তবে স্বেচ্ছায় সেই সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা ব্যক্তিগত উদারতা হিসেবে গণ্য হবে।




