পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তার মাঝেই নতুন এক চ্যালেঞ্জের কথা সামনে এলো। প্রকৃত অর্থে কার্বনমুক্ত জ্বালানি হতে হলে নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে পানি থেকে এই হাইড্রোজেন উৎপাদন করা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের সিংহভাগ হাইড্রোজেনই প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়, যা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে।

হাইড্রোজেন অর্থনীতির এই পথে সবচেয়ে বড় এবং কম আলোচিত প্রতিবন্ধকতা হলো এর পরিকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রে হাইড্রোজেন পরিবহনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। হাইড্রোজেনের অতি ক্ষুদ্র অণুগুলো ইস্পাতের পাইপের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে সহজে প্রবেশ করে সংকর ধাতু বা অ্যালয়কে ভঙ্গুর করে তোলে। ২০২৩ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানী এম্রে গেনসার জানিয়েছিলেন, বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে সরাসরি হাইড্রোজেন সঞ্চালন করা সহজ নয়।

গেনসার প্রধানত হাইড্রোজেন পরিবহন ও সংরক্ষণের সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করলেও সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, হাইড্রোজেন যুগে শুধু পাইপলাইন নয়, আরও বহু অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। গ্যাস টারবাইনের অভ্যন্তরে থাকা উচ্চ এবং পরিবর্তনশীল তাপমাত্রায় ধাতুকে ভঙ্গুর করার হাইড্রোজেনের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষকেরা নিকেলভিত্তিক সুপারঅ্যালয় দিয়ে তৈরি গ্যাস টারবাইনের ওপর হাইড্রোজেনের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রায় ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছালে এই পরীক্ষা চালানো হয়। তাপ প্রয়োগের ফলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় হাইড্রোজেন এই ধাতুগুলোর দ্বিগুণ ক্ষতি করে, যা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট, বিদ্যমান অবকাঠামো হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে সহ্য করতে পারবে না। প্রয়োজন হবে পুরো পরিকাঠামোর রূপান্তর এবং সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অ্যালয় আবিষ্কার। তাপমাত্রার ভিন্নতায় হাইড্রোজেন কীভাবে ধাতুর ক্ষতি করে তার ধরনও বদলে যায়। বেশির ভাগ সমস্যা দেখা দেয় ৪০০ থেকে ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে টারবাইনের নমনীয়তা প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

জার্মানির সাসটেইনেবল মেটেরিয়ালসের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষক শিঝেন দং জানান, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন নিকেলভিত্তিক সুপারঅ্যালয়ের সংযোগস্থল ও ত্রুটিপূর্ণ অংশে আটকে থাকে। কিন্তু উচ্চ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো কার্বনের খালি জায়গার দিকে চলে যায় এবং কার্বাইডের আংশিক পচন ঘটায়। একইসঙ্গে হাইড্রোজেন ও কার্বন পরমাণু বিক্রিয়া করে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। এই অত্যন্ত উচ্চ চাপের মিথেন গ্যাস ভেতরের দিকে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে, যা সংযোগস্থলগুলোকে দুর্বল করে স্থায়ী ক্ষতি করে।

সংকর ধাতুতে কার্বাইডের প্রধান কাজ হলো শক্তি বা দৃঢ়তা প্রদান করা, যা উচ্চ চাপের গ্যাস ধারণ করতে এবং টারবাইনের মুখোমুখি হওয়া বল সহ্য করতে অপরিহার্য। তবে নতুন এই গবেষণা বলছে, কার্বাইড-সমৃদ্ধ এই ধাতুগুলো হাইড্রোজেনভিত্তিক প্রযুক্তির জন্য উপযুক্ত নয়। অন্যদিকে, হাইড্রোজেন ভঙ্গুরতা প্রতিরোধে সক্ষম বর্তমান ধাতুগুলো বেশ নরম প্রকৃতির, যা টারবাইনের কাজের জন্য আদর্শ নয়।

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে হাইড্রোজেন পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য উপযোগী নতুন উপাদানের সন্ধান শুরু করেছেন। জার্মানি, চীন ও ফ্রান্সের একদল গবেষক অ্যালুমিনিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম সংকর ধাতুর সঙ্গে স্ক্যান্ডিয়াম মিশিয়ে আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছেন। এতে উপাদানের শক্তি ৪০ শতাংশ এবং হাইড্রোজেন ভঙ্গুরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে টারবাইনের উত্তপ্ত ও ঘূর্ণমান অংশগুলোর জন্য এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে এবং নতুন ধরনের সংকর ধাতু আবিষ্কার করতে হবে। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট।