দেশের হালকা প্রকৌশল খাতের ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তীব্র চাপের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কারখানা এই খাতে রয়েছে, যেখানে কর্মরত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। তবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না মেলায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পানির কল তৈরির প্রতিষ্ঠান ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের অবস্থা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এক যুগের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানটির এমডি মো. সোলায়মান পারসী জানান, পিতল গলানোর জন্য তাদের কারখানায় সার্বক্ষণিক গ্যাসের ফার্নেস চালাতে হয়। কিন্তু গত চার-পাঁচ মাস ধরে গ্যাসের চাপ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, এখন তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, কারখানা চালু রাখতে দৈনিক ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়, যা তুলতে হলে ৭-৮ লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন প্রয়োজন। বর্তমানে উৎপাদন ৩-৪ লাখ টাকায় নেমে আসায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলেছে; এক বছর আগে ৩০ জন কর্মী থাকলেও এখন মাত্র ১২ জন কাজ করছেন।
যাত্রাবাড়ীতে ফয়সল পলিমারের মতো আরও প্রায় সাড়ে তিন শ ছোট-বড় ট্যাপ তৈরির কারখানা রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব কাস্টিং বা মেল্টিং ব্যবস্থা রাখলেও ছোট উদ্যোক্তারা অন্য কাস্টিং কারখানা থেকে মোল্ড ব্যবহার করে পিতলের কলের প্রাথমিক রূপ তৈরি করান। গ্যাসের অভাবে এই এলাকার প্রায় সব কারখানার উৎপাদনেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেরানীগঞ্জ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, পাবনাসহ দেশের প্রধান শিল্প ক্লাস্টারগুলোতেও একই চিত্র। জানা গেছে, অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। যেসব প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে লাইনে প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কাস্টিং ও হিট ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বাজারে হালকা প্রকৌশল পণ্যের চাহিদা আগেই কমে গিয়েছিল, তার ওপর জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ। অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে যাওয়ায় কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়া এবং ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজীপুরের শালনায় কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাতা অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এমডি মো. শেখ সাদী জানান, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়, প্রতিবার অন্তত এক ঘণ্টা থাকে না। ফলে অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, যে কাজ আধা ঘণ্টায় হতো, এখন সেখানে অর্ধেক দিন লেগে যায়। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা সরিয়ে অন্য কোথাও নেওয়ার কথা ভাবছেন বলেও জানান তিনি। ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় নিজেদের পকেটের টাকা ও ধারদেনা করেই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে বলেও তাঁর মন্তব্য।
বিদ্যুৎ না থাকলেও বিল আগের চেয়ে বেশি আসার অভিযোগ উঠেছে। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক ডাইস নির্মাতা ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এমডি মো. মফিজুল ইসলাম জানান, গত এক মাসে জেনারেটর চালাতে দৈনিক ২০০ লিটার তেল খরচ হচ্ছে। জেনারেটর খরচ ৪০ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশ বেড়েছে, অপরদিকে উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় কারখানা বন্ধের আশঙ্কা করছেন তিনি। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কথা তাঁদের কাছে জানাচ্ছেন। সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পেয়েও সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারছে না, ফলে তারা নাজুক অবস্থায় পড়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা তাদের জন্য কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের কাছে উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানান তিনি।




