দীর্ঘদিন ধরে গরুর দুধকে 'সম্পূর্ণ খাবার' হিসেবে গণ্য করা হয়ে এসেছে। বিশেষ করে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, রিবোফ্লাভিন এবং ভিটামিন বি১২-এর মতো প্রয়োজনীয় উপাদানের উপস্থিতির কারণে শিশু-কিশোরদের শারীরিক বৃদ্ধি ও হাড়ের মজবুত করতে দুধ পানের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দুধের প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়, যা মূলত বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
হার্ভার্ডের প্রথিতযশা পুষ্টিবিদ ডেভিড লুডউইগ এবং ওয়াল্টার উইলেট প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন তিন কাপ দুধ পানের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সুস্থ থাকার জন্য সবার ক্ষেত্রে এত পরিমাণ দুধ পান করা অপরিহার্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের প্রভাব সব ক্ষেত্রে এক নয়। যেমন, দুধে থাকা ক্যালসিয়াম কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং দইয়ের মতো গাঁজন করা খাবার টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল; অধিক দুধ পান করলেই যে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমবে, তার কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি।
সুইডেনের একটি বড় মাপের গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৪ সালে বিএমজে-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নারী প্রতিদিন তিন গ্লাস বা তার বেশি দুধ পান করেন, তাঁদের মৃত্যুহার এবং হিপ ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি এক গ্লাসের কম দুধ পানকারী নারীদের তুলনায় বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত দুধ পানের সঙ্গে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। গবেষকদের ধারণা, দুধের ল্যাকটোজ ভেঙে তৈরি হওয়া 'ডি-গ্যালাকটোজ' শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ বাড়িয়ে বার্ধক্যজনিত সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে তারা সতর্ক করেছেন যে, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য প্রভাব এখানে কাজ করতে পারে।
দুধ পানের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স এবং প্রোটিন অ্যালার্জি। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক মানুষের শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমের অভাব থাকে, ফলে তারা দুধের প্রাকৃতিক শর্করা হজম করতে পারে না। এর ফলে পেট ফাঁপা, গ্যাস এবং ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া শিশুদের মধ্যে দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি হওয়ার প্রবণতা থাকে। স্বাস্থ্যগত অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রোস্টেট ক্যানসারের সম্ভাবনা (অতিরিক্ত সেবনে) এবং ত্বকে ব্রণের সমস্যা, বিশেষ করে যারা স্কিমড মিল্ক বা কম চর্বির দুধ পান করেন। পাশাপাশি পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধের স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স নেই, তারা পরিমিত পরিমাণে দুধ খেতে পারেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যালসিয়ামের বিকল্প উৎস হিসেবে তিল, বাদাম, টফু এবং সবুজ শাকসবজি বেছে নেওয়া যেতে পারে। যারা সাধারণ দুধ সহ্য করতে পারেন না, তাদের জন্য ল্যাকটোজ-মুক্ত দুধ, দই বা উদ্ভিজ্জ পানীয় (সয়া, ওট বা আমন্ড মিল্ক) ভালো বিকল্প হতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২ ও ক্যালসিয়ামের মান যাচাই করে নেওয়া জরুরি।




