গণিতশাস্ত্রের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ 'নাভিয়ার-স্টোকস' (Navier-Stokes) সমীকরণ সমাধান করার দাবি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই (OpenAI)। এই সমস্যাটি ছিল ক্লের ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউটের নির্ধারিত সাতটি 'মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম'-এর একটি, যার সঠিক সমাধানের জন্য ১ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের একটি অপ্রকাশিত অভ্যন্তরীণ মডেল এবং প্রায় ১০ হাজার সাব-এজেন্টের সমন্বয়ে গঠিত একটি মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে এই সমীকরণগুলো ভেঙে পড়ে বা 'ব্লো আপ' করে। এই সমীকরণগুলো মূলত পদার্থবিজ্ঞানের ফ্লুইড ডায়নামিক্স বা তরল গতিবিদ্যার অংশ, যা আবহাওয়া পূর্বাভাস থেকে শুরু করে বিমান নকশায় ব্যবহৃত হয়।
তবে এই অর্জনের পেছনে তীব্র বিতর্ক ও সংঘাত তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কোর্ন্ট ইনস্টিটিউটের গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার এবং অ্যানথ্রোপিক-এর গণিতবিদ লেভেন্ট আলপেগে দাবি করেছেন, তারা দীর্ঘ এক বছর ধরে এই সমস্যাটি নিয়ে কাজ করছিলেন এবং এআই মডেলের সহায়তায় এর একটি অংশের সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। বাকমাস্টারের অভিযোগ, ওপেনএআই-এর গবেষকরা তাদের এই বিশেষ পদ্ধতিটি চুরি করে পুরো সমাধানটি বের করেছে। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, ওপেনএআই হয়তো তার 'কোডেক্স' (Codex) অ্যাকাউন্টের ডেটা ব্যবহার করেছে অথবা তাদের মডেলটি বাকমাস্টারের ব্যক্তিগত সেশন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। যদিও ওপেনএআই-এর গবেষক সেবাস্টিয়েন বুবেক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, তারা বাইরের কোনো ডেটা ব্যবহার করেননি।
ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বাকমাস্টার দাবি করেন যে, ওপেনএআই-এর গবেষক বুবেক তাকে ক্যারিয়ার ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। বাকমাস্টারের কথা অনুযায়ী, ওপেনএআই তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল যে তিনি তার আংশিক সমাধানের প্রবন্ধ প্রকাশ করতে পারেন, তবে শর্ত ছিল তাকে স্বীকার করতে হবে যে ওপেনএআই সম্পূর্ণ সমাধানটি করেছে এবং প্রবন্ধ থেকে লেভেন্ট আলপেগের নাম সরিয়ে ফেলতে হবে, কারণ তিনি অ্যানথ্রোপিক-এর সাথে যুক্ত। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বুবেকের পক্ষ থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, বুবেক সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিযোগগুলোকে মিথ্যা এবং উসকানিমূলক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এই পুরো ঘটনাটি কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে বড় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের প্রখ্যাত গণিতবিদ টেরেন্স টাও সতর্ক করেছেন যে, এআই কোম্পানিগুলো কেবল তাদের মডেলের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য এই ধরণের গাণিতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে মার্কেটিং টুল হিসেবে ব্যবহার করছে। তার মতে, এআই কেবল উত্তর খুঁজে দিচ্ছে, কিন্তু তার পেছনে কোনো গাণিতিক অন্তর্দৃষ্টি বা যুক্তি প্রদান করছে না। এতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গণিতবিদদের সৃজনশীলতা এবং গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গণিতবিদদের মতে, উত্তরের চেয়ে সেই পথটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ যা দিয়ে সমাধানে পৌঁছানো হয়, কিন্তু এআই সেই প্রক্রিয়াটিকে সংকুচিত করে ফেলছে। শেষ পর্যন্ত, এই প্রতিযোগিতা কেবল দুটি কোম্পানির লড়াই নয়, বরং মানুষের মেধা ও সৃজনশীলতার অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




