সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের শশাডাঙ্গা গ্রামে গত শুক্রবার সকালে মাছের ঘেরে দেখা মেলে এক ভিন্ন চিত্রের। পানির ওপর থার্মোকলের তৈরি ভেলায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে কাদামাখা সবুজ শেওলা। কোমর পানিতে নেমে শ্রমিকেরা ঘের থেকে শেওলা তুলে সেই ভেলায় জমাচ্ছেন। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে ঘের পরিষ্কারের কাজ চলছে, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এটি একটি জীবিকার আয়োজন। এক ঘেরের উদ্বৃত্ত শেওলা তুলে তা অন্য ঘেরে মাছের খাবার হিসেবে বিক্রি করছেন তাঁরা।

ঘেরের মধ্যে ভেলা টেনে শেওলা তুলছিলেন রাজকুমার গাইন। তিনি বলেন, একদিকে ঘের পরিষ্কার হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁর আয়ও হচ্ছে। তাঁর মতে, কোনো ঘেরে শেওলা বেশি হয়ে গেলে মাছের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। তবে কার্পজাতীয় সাদা মাছের ঘেরে এই শেওলা খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এক ঘের থেকে সংগ্রহ করা শেওলা অন্য ঘেরে বিক্রি করা হয়। স্থানীয়ভাবে একে 'কাটা শেলা' নামে ডাকা হয়। এক ভ্যান শেওলার দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠছে।

শশাডাঙ্গা গ্রামের সড়কের পাশে নিজের ঘের থেকে তোলা শেওলা ভ্যানে তুলছিলেন খলিলুর রহমান। তিনি জানান, তাঁর ঘেরে শেওলা এত বেশি হয়ে গিয়েছিল যে তা পরিষ্কার করা জরুরি হয়ে পড়ে। এক ভ্যান শেওলা তিনি ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। স্থানীয় মাছচাষি আমিনুর রহমান এই শেওলা কিনে নেন। তাঁর ১২ বিঘার ঘেরে বর্ষা মৌসুমে রুই, গ্রাস কার্প ও মৃগেলসহ বিভিন্ন মাছ চাষ হয়। তিনি বলেন, সাদা মাছ শেওলা খুব পছন্দ করে, তাই তিনি মাছের খাবারের জন্য শেওলা কিনে ঘেরে ছেড়ে দেন। এভাবেই এক ঘেরের মালিকের কাছে যা অতিরিক্ত, অন্য ঘেরের মালিকের কাছে তা মূল্যবান খাবার। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শেওলা সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রির একটি ছোট্ট অর্থনীতি।

দেবহাটার পারুলিয়া এলাকায় শেওলা সংগ্রহের কাজের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট। ঘেরের পাড়ের সড়কের পাশে সারি করে রাখা শেওলার স্তূপ দেখা যায়। পানিতে ভাসছে থার্মোকলের ভেলা। শ্রমিকেরা কেউ পানিতে নেমে শেওলা তুলছেন, কেউ ভেলা টেনে আনছেন, আবার কেউ সড়কের পাশে ভ্যানে তা তুলছেন। সেখানে কাজ করছিলেন আবু সাঈদ। তিনি বলেন, নোনাপানির ঘেরে শেওলা বেশি জন্মে। সেখান থেকে সংগ্রহ করে মিষ্টিপানির সাদা মাছের ঘেরে বিক্রি করেন তিনি। এলাকায় কাজের সুযোগ কম থাকায় বছরের পাঁচ থেকে ছয় মাস শেওলা সংগ্রহ ও বিক্রি করেন। এতে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। শীত এলে শেওলা কমে যায়, তখন দিনমজুরের কাজ করেন তিনি।

একই চিত্র দেখা যায় দেবহাটার পাশের আশাশুনি উপজেলার মহেশ্বরকাটি এলাকাতেও। সেখানে শেওলা সংগ্রহ করছিলেন লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, ঘেরে প্রায় সব জায়গাতেই শেওলা হয়। অতিরিক্ত হয়ে গেলে তা পরিষ্কার করতে হয়। সেই শেওলা তিনি সাদা মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে বিক্রি করেন।

চিংড়িঘেরের মালিকদের জন্য শেওলা অনেক সময় বাড়তি ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেবহাটার ব্যবসায়ী অজিয়ার রহমানের ১৫ বিঘা জমির ঘেরে চিংড়ি চাষ হয়। তিনি বলেন, শেওলা বেশি হলে চিংড়ির পোনার চলাচলে সমস্যা হয় এবং চিংড়ির বৃদ্ধিও কমে যায়।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, চিংড়ির ঘেরে অতিরিক্ত শেওলা চিংড়ির চলাচলে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশে ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। তাই অতিরিক্ত শেওলা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তবে সেই শেওলা অন্য মাছের ঘেরে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলে ঘের পরিষ্কারের পাশাপাশি মাছের খাদ্যেরও যোগান হয়।