কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) আগমনের শুরুতে দাবি করা হয়েছিল এটি হবে এক মহান সমতাকরণ যন্ত্র। ধারণা ছিল, এটি অভিজ্ঞ এবং অনভিজ্ঞের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনবে এবং কর্মীদের আরও উচ্চমূল্যের কাজে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। তবে দুই বছর এবং ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিটের অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই-এর ঝুঁকি যাদের ওপর বেশি, তাদেরই বড় ধরনের স্টক পোর্টফোলিও রয়েছে, যা এই ঝুঁকি সামলাতে সক্ষম। অর্থাৎ, যারা আগে থেকেই অর্থনৈতিকভাবে সফল ছিলেন, এই প্রযুক্তি তাদেরই আরও বেশি সুবিধা দিচ্ছে।

মর্গ্যান স্ট্যানলির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তথাকথিত 'CHIC' (কলেজ শিক্ষিত, উচ্চ আয় এবং শহরে বসবাসকারী) পরিবারগুলোর ওপর। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পেশার প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মীর স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে এবং তাদের গড় বেতন নিম্ন-ঝুঁকিপূর্ণ পেশার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি (৯৭,০০০ ডলার বনাম ৪৬,০০০ ডলার)। তবে এই অভিজাত শ্রেণির জন্য ঝুঁকির কথা বলা হলেও তারা আসলে নিরাপদ। কারণ, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে মার্কিন পরিবারগুলোর সম্পদের যে ২১ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, তার অর্ধেক এসেছে সরাসরি ইক্যুইটি হোল্ডিং থেকে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) ইনডেক্সের আয়ের ৪০ শতাংশই আসছে এআই সংশ্লিষ্ট স্টক থেকে। ফলে উচ্চবিত্তদের শ্রম আয় কিছুটা কমলেও শেয়ার বাজারের মুনাফায় তা খুব সহজেই পুষিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে, নিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের ইক্যুইটি সম্পদ তাদের এক বছরের মোট মজুরির সমান।

অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের গবেষণা বলছে, এআই-এর কারণে ব্যাপক ছাঁটাই না হলেও কর্মীদের মজুরির প্রবৃদ্ধিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মীদের ক্ষেত্রে বাস্তব মজুরির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেখা গেছে, সবচেয়ে কম মজুরির কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধি ১০.৭ পয়েন্ট কমেছে, যেখানে উচ্চ আয়ের কর্মীদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। মূলত সেবা খাতের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া আইএসই বিজনেস স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-চালিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জুনিয়র পদের নিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে এবং নতুনদের শুরুর বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে থাকা কর্মীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করপোরেট মুনাফার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত প্রবণতা। মর্গ্যান স্ট্যানলির রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে নন-ফাইনান্সিয়াল করপোরেট মুনাফা প্রায় ৪০০.৯ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। তবে এই মুনাফা বৃদ্ধি এআই-এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ার কারণে হয়নি, বরং কোম্পানিগুলো এআই-এর দোহাই দিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে এবং কর্মীদের মজুরি স্থির রেখেছে। জেপি মর্গান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বৈশ্বিক কৌশলী ডেভিড কেলি জানিয়েছেন, বেকারত্বের হার কম থাকলেও নিয়োগের গতি কমেছে এবং ইউনিয়নগুলোর দুর্বলতার কারণে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করতে পারছেন না।

এদিকে, সাধারণ মানুষের মাঝে এআই-এর দৃশ্যমান রূপ 'ডেটা সেন্টার' নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গ্যালপ এবং পলিটিকো-র পোল অনুযায়ী, অধিকাংশ আমেরিকান তাদের এলাকায় ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিরোধী। তাদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের ফলে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে এবং স্থানীয় এলাকার চেয়ে বাইরের পক্ষগুলোই বেশি লাভবান হচ্ছে। এই জনরোষের ফলে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৭৫টি প্রকল্প বাধাগ্রস্ত বা স্থগিত হয়েছে। এমনকি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য বড় ডেটা সেন্টারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

তবে সেন্ট লুইস ফেডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পেশার নাম দিয়ে এআই-এর প্রভাব পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তথাকথিত উচ্চ-ঝুঁকির পেশার মানুষ (যেমন মেডিকেল সেক্রেটারি) গোপনীয়তা ও ভুলের আশঙ্কায় এআই ব্যবহার করছেন না। আবার কম্পিউটার মেরামতকারী বা বিশেষ শিক্ষা শিক্ষকদের মতো পেশার মানুষ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি এআই গ্রহণ করছেন। সব মিলিয়ে, এআই যে পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মগুলো ভেঙে সাম্য আনবে, সেই প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি; বরং এটি বর্তমানের অসমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।