কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কর্পোরেট জগতে এখন এক নতুন ধরনের ‘ফোমো’—পিছিয়ে পড়ার ভয়—দেখা যাচ্ছে। আগে তরুণরা শনিবার রাতের কোনো পার্টিতে না যেতে পারার আক্ষেপে এ শব্দটি ব্যবহার করত; এখন বোর্ডরুমগুলোতে এআই বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভয়। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকায় মূলধন ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বোর্ড সদস্যরা দুশ্চিন্তায় থাকেন। আর এর ফলাফল যেহেতু অত্যন্ত অনিশ্চিত, তাই তথ্য ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া নেতৃত্বের জন্য বিষয়টি অতিরিক্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে সামনে এলেন ফরাসি প্রযুক্তি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপজেমিনির প্রধান নির্বাহী আইমান ইজ্জত। ফরচুন ৫০০ ইউরোপের তালিকাভুক্ত এই জায়ান্ট সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক প্রতিষ্ঠান ক্যাপজেমিনি গভর্নমেন্ট সল্যুশনস বিক্রির ঘোষণায়। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টে (আইসিই) ট্র্যাকিং ও অপসারণের তথ্য সরবরাহ করত। এআই ব্যয় নিয়ে প্রযুক্তি খাতে যে দরপতন চলছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাপজেমিনির শেয়ার দরও চাপে রয়েছে।

আইসিই নিয়ে বিতর্ক ছড়ানোর আগেই ইজ্জতের সঙ্গে কথা বলেছিল ফরচুন। পরে তিনি লিংকডইনে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, মার্কিন গোপন তথ্য সুরক্ষার স্বার্থে ওই সহায়ক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করেছিল। সাক্ষাৎকারে ইজ্জত জানান, ব্যবসায়ী নেতারা এআই নিয়ে যেন সূক্ষ্ম এক ভারসাম্যের পথে হাঁটছেন—খুব দ্রুত এগিয়ে যাওয়া কিংবা একেবারে শুরুতে আটকে থাকা, কোনোটিই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, “শেখার বক্ররেখার অনেক আগে চলে যাওয়াও ঠিক না। কারণ সেক্ষেত্রে আপনি এমন কিছু গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করছেন, যার চাহিদা কারও নেই।” এআই কোনো বিস্ফোরক পরিবর্তন নয়, বরং ছোট ছোট ধাপে এর বিকাশ ঘটবে। নেতারা মেটাভার্সের প্রচারণার কথা মনে করতে পারেন—যেখানে নাচের অবতার হয়ে লেনদেনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। ক্যাপজেমিনিও এক সময় মেটাভার্স ল্যাব নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিল। মার্ক জাকারবার্গ তো এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে নিজের কোম্পানির নামই বদলে দিয়েছিলেন। তবে এয়ার ফ্রায়ারের মতোই এর সময় এখন সম্ভবত শেষ।

নতুন পদ্ধতি হলো তত্পরতা: বড় পরিসরে প্রয়োগের আগে ছোট ছোট পরীক্ষা ও পাইলট প্রকল্প। ক্যাপজেমিনি এখন ৬জি মোবাইল প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং রোবোটিকসের জন্য ল্যাব তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তির কোন অংশ ভবিষ্যতে মেটাভার্সের মতো পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা কেউ জানে না। ইজ্জত বলেন, “সবকিছু কি পরিণত হওয়ার জন্য প্রস্তুত? না। কিন্তু আমরা সেখানে থাকতে চাই যাতে জিনিস পরিণত হতে শুরু করলে দেখতে পাই, যখন সত্যিই স্কেল আপ করা সম্ভব তখন যেন অপেক্ষা করতে না হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের কিছু করতে হবে। তাই বিনিয়োগ করতে হবে—কিন্তু অতিরিক্ত নয়—যাতে প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকা যায় এবং যখন গ্রহণ ত্বরান্বিত হবে তখন স্কেল করার প্রস্তুতি থাকে।”

ফরচুন ৫০০ ইউরোপে ক্যাপজেমিনির অবস্থান ১৭২তম। আগে যেমন লেখা হয়েছে, অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এআইকে মূলত আলাদা ব্যবসায়িক ইউনিটগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখছে। এটি শুরু হতে পারে, তবে এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি নয়—যেখানে অর্থ, মানবসম্পদ, ক্রয় বা সাপ্লাই চেইনের ডেটা একত্রিত করে নতুনভাবে সংযোগ ঘটানো যায়। ইজ্জত বলেন, “এআই একটি ব্যবসা, প্রযুক্তি নয়।” তিনি সতর্ক করে বলেন, নেতারা প্রায়ই এআইকে “আলাদাভাবে পরিচালিত একটি ব্ল্যাক বক্স” হিসেবে দেখেন। কিন্তু এআই আসলে ব্যবসাকে রূপান্তরের বিষয়, শুধু প্রতিষ্ঠান চালু রাখার হাতিয়ার নয়। “প্রশ্ন হলো—আপনার ব্যবসা কীভাবে এআই দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হতে পারে? আপনার অর্থ বিভাগ আরও দক্ষ হবে কি না, সেটি নয়। সেই দায়িত্ব আপনার সিএফও নেবেন।”

এআই নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হলো “হিউম্যান ইন দ্য লুপ”। তবে সম্প্রতি এক সিনিয়র প্রযুক্তি নির্বাহী এই ধারণাকে “পুরোপুরি ভুল” বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার মতে, আমাদের বলা উচিত “হিউম্যান ইন দ্য লিড”। অর্থাৎ মানুষের নেতৃত্বই মুখ্য। “হিউম্যান-সেন্ট্রিসিটি” শতাব্দী প্রাচীন একটি সামাজিক দর্শন, যা ১৯৫০-এর দশকের এরগনোমিক্স আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকৌশল পদ্ধতিতে রূপ নিয়েছে। ইজ্জত বলেন, “এআই-হিউম্যান সেন্ট্রিসিটি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। মূল বিষয় হলো মানুষের সঙ্গে এআইকে একীভূত করা। মানুষ কীভাবে এজেন্টকে বিশ্বাস করবে? এজেন্ট মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু মানুষ এজেন্টকে সত্যিই বিশ্বাস করে না।”

এরগনোমিক্স ছিল মানুষের জন্য উপযোগী চেয়ার তৈরির বিষয়, অফিসে সহজে রাখা যায় বা স্ট্যাক করা যায় এমন চেয়ার নয়। এআইকে মানুষের সঙ্গে মানানসই করে গড়ে তোলাও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ। খারাপ চেয়ারে পিঠে ব্যথা হয়, খারাপ এআইয়ের পরিণতি আরও মারাত্মক হতে পারে। ফরচুন সিইও ফোরামের সর্বশেষ কভারেজ ও আপডেটের জন্য প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠায় যেতে পারেন। গল্পটি মূলত ফরচুন.কমে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল।