২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে 'এজেন্টিক এআই' বা স্বয়ংক্রিয় কার্যসম্পাদনকারী এআই এজেন্ট। দীর্ঘদিনের চ্যাটবট সংস্কৃতির সাথে এর মূল পার্থক্য হলো এর কাজ করার ক্ষমতা। প্রচলিত চ্যাটবট কেবল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু এজেন্টিক এআই ব্যবহারকারীর হয়ে সরাসরি কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এটি নিজে থেকে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে তথ্য খোঁজা, ফর্ম পূরণ করা, পণ্যের দামের তুলনা করা এবং ব্যবহারকারীর অনুমতি সাপেক্ষে পেমেন্ট সম্পন্ন করার মতো জটিল কাজগুলো খুব দ্রুত করে ফেলতে সক্ষম।

প্রযুক্তির এই দৌড়ে বর্তমানে শীর্ষস্থানে রয়েছে গুগল, যারা তাদের জেমিনাই-৩ মডেলের ওপর ভিত্তি করে 'অটো-ব্রাউজ' সুবিধা নিয়ে এসেছে। এই সুবিধাটি ইতিমধ্যে ডেস্কটপ ও অ্যান্ড্রয়েড উভয় প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে। একইভাবে ওপেনএআই-এর 'অ্যাটলাস' এবং পারপ্লেক্সিটির 'কমেট' ব্রাউজারকে কেবল তথ্য খোঁজার মাধ্যম থেকে সরিয়ে একে একজন সক্রিয় সহকারীতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। মূলত ধৈর্য এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার কারণেই এজেন্টিক এআই সাধারণ চ্যাটবটের চেয়ে আলাদা। এটি একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে; প্রয়োজনে একাধিক সাইট থেকে তথ্য যাচাই করে ফলাফল বিশ্লেষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালেন্ডার, জিমেইল এবং ম্যাপস সমন্বয় করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা বা হোটেলের দাম মিলিয়ে বুকিং করার মতো কাজগুলো এখন মুহূর্তের মধ্যেই সম্ভব হচ্ছে।

তবে এই অসীম সুবিধার পেছনে লুকিয়ে আছে মারাত্মক কিছু ঝুঁকি। এজেন্টিক এআই যখন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন ভুল পণ্য অর্ডার করা বা ভুল তারিখে বুকিং করার সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সাইবার নিরাপত্তা; প্রতারণামূলক বা নকল ওয়েবসাইট শনাক্ত করার ক্ষমতা সব সময় এই এআই-এর থাকে না, যার ফলে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ভুল জায়গায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া, পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, স্বয়ংক্রিয়তা যত বাড়বে, মানুষের তদারকির প্রয়োজনীয়তা তত বৃদ্ধি পাবে।

এই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু নির্দেশিকা দিয়েছেন। প্রথমত, সরাসরি টাকা লেনদেনের বদলে দাম তুলনা বা তথ্য খোঁজার মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ দিয়ে শুরু করা উচিত। দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এআই-এর পরিকল্পনাটি একবার যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, অ্যাকাউন্টের পারমিশন নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং কোন সাইটে এআই প্রবেশ করতে পারবে তা সীমিত রাখা জরুরি। পরিশেষে, পেমেন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে এআই-কে পূর্ণ স্বাধীনতা না দিয়ে সর্বদা 'অনুমোদন' মোডে রাখা নিরাপদ। শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নটি থেকেই যায় যে, আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় জীবন সহজ করছি, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একটি অদৃশ্য কোডের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। প্রতিটি 'অনুমতি' বাটনে চাপ দেওয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে এই প্রযুক্তির সীমানা।