বর্তমান যুগের ডিজিটাল কার্যক্রমকে আমরা প্রায়ই 'ক্লাউড' বা ভার্চুয়াল মনে করি, কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রের তলদেশে বিছানো ফিজিক্যাল সাবমেরিন ক্যাবল বা সমুদ্রগর্ভস্থ তারের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবকাঠামোর দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের ক্ষতির কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন ব্যাংক, ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এবং ক্লাউড-ভিত্তিক ব্যবসায় ব্যাপক ইন্টারনেট বিভ্রাট দেখা দেয়। একইভাবে ২০২৫ সালে লোহিত সাগরের ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে ডেটা ট্রাফিক বিকল্প দীর্ঘ পথে ঘুরিয়ে নিতে হয়, যা সেবার গতি কমিয়ে দেয় এবং ব্যবসায়িক খরচ বাড়িয়ে দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বর্তমানে ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলোর এখন প্রতি সেকেন্ডে ৪০০ থেকে ৮০০ গিগাবিট (gbps) ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হচ্ছে। অধিকাংশ দেশ ও প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কেবল কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং ডেটা সেন্টার তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, কিন্তু এই সিস্টেমগুলোর সংযোগকারী নেটওয়ার্কের কথা ভুলে যাচ্ছে। টাটা কমিউনিকেশনসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এআই বিনিয়োগকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিলেও, ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো পুরনো বা অনুন্নত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। ফলে সঠিক নেটওয়ার্ক বিনিয়োগ না থাকলে ব্যয়বহুল এআই অবকাঠামো থেকে প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া সম্ভব হবে না এবং ডেটা অ্যাক্সেসে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এশীয় অঞ্চলে এই ডিজিটাল ট্রানজিটের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সিঙ্গাপুর ও ভারত। সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ডেটা সেন্টারের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের মতো শহরগুলোতে ক্যাবল ল্যান্ডিং পয়েন্ট ও ডেটা সেন্টার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারত এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। তবে এআই-চালিত ডেটা চাহিদার অস্থিরতা মোকাবিলায় এখন পুরনো লিনিয়ার নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচারের পরিবর্তে আরও গতিশীল ও নমনীয় সংযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সমুদ্রতলে ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপন করলেই হবে না; প্রকৃত স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষমতা পরিকল্পনা, নেটওয়ার্কের বৈচিত্র্য, দ্রুত মেরামত ব্যবস্থা এবং সুশৃঙ্খল লাইফসাইকেল অপারেশনের মতো চারটি বিষয়ে সমন্বিত নজর দেওয়া জরুরি। উপকূলীয় ল্যান্ডিং স্টেশনে কোনো বাধা সৃষ্টি হলে তা পুরো ট্রান্স-ওশেনিক ক্যাবলের গতি কমিয়ে দিতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে সরকারি উদ্যোগও শুরু হয়েছে। সম্প্রতি 'এনহ্যান্সড আসিয়ান গাইডলাইনস' গৃহীত হয়েছে, যেখানে সাবমেরিন ক্যাবল মেরামতের সময় সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিশেষে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হলো, ডেটা সেন্টার বা কম্পিউটিং ক্ষমতার দৃশ্যমান লাভের পেছনে ছুটে সংযোগকারী ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোকে অবহেলা করা ঝুঁকিপূর্ণ। কানেক্টিভিটিকে কেবল আইটি বাজেটের একটি খরচ হিসেবে না দেখে একে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, সমুদ্রের তলদেশের এই অদৃশ্য লাইফলাইনটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় কোনো দেশের অবস্থান।




