স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েকটি শব্দ টাইপ করলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেকোনো ছবি এঁকে দেয়—এই অভিজ্ঞতা এখন প্রায় জাদুর মতো লাগে। আশির দশকের শৈলীতে ছবি তৈরির সাম্প্রতিক ট্রেন্ড তো আবার সেই জাদুকরী অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সহজ কাজটির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তা অধিকাংশ ব্যবহারকারীর অজানা। কেউ যখন নিজের ঘরে বসে এআই টুলে একটি নির্দেশ দেন, তখন তাঁর নিজের পানি খরচের কথা ভাবতে হয় না, তবে পর্দার ওপারে ডেটা সেন্টারগুলোয় সেই নির্দেশ পালন করতে রীতিমতো পানির মহোৎসব চলে। প্রশ্ন উঠছে—এত পানি আসলে কোথা থেকে আসে, আর এর খরচ কীভাবে হিসাব করা হয়? এমনকি পানির এই চাহিদা মেটাতে সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার বসানোর মতো পরিকল্পনাও চলছে। চলুন, পুরো প্রক্রিয়াটি খুলে বলা যাক।

ধরা যাক, কেউ চ্যাটজিপিটি বা মিডজার্নিতে লিখলেন, 'পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের ছবি আঁকো।' কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এই নির্দেশ ইন্টারনেট হয়ে পৌঁছে যায় দূরবর্তী কোনো ডেটা সেন্টারে। সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে ছবিটি তৈরি করে। ব্যবহারকারীর ফোন বা ল্যাপটপে কোনো প্রক্রিয়াকরণ হয় না, সব ভার সার্ভারের ওপর। সমস্যা হলো, এই সার্ভারগুলো যখন একসঙ্গে জটিল গণনা করে, তখন তারা প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। তাপ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই সার্ভার ঠান্ডা রাখা অপরিহার্য। বেশিরভাগ বড় ডেটা সেন্টার 'ইভাপোরেটিভ কুলিং' বা বাষ্পীভবন শীতলীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা অনেকটা মানুষের শরীরের ঘামের মতো কাজ করে। গরমে ঘাম শুকিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়, তেমনই গরম সার্ভারের পাশ দিয়ে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। পানি সার্ভারের তাপ শুষে নেয়, তারপর সেই গরম পানি কুলিং টাওয়ারে পাঠানো হয়, যেখানে কিছু অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং বাকিটা ঠান্ডা হয়ে আবার সার্ভারে ফিরে আসে।

এই পদ্ধতিতে পানির অপচয় হয় দুটি কারণে। প্রথমত, বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ায় প্রতি চক্রে পানির কিছু অংশ হারিয়ে যায়, তাই নিয়মিত নতুন পানি যোগ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পানির বাষ্পীভবনের পর অবশিষ্ট পানিতে লবণ ও খনিজ পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা পাইপে জমে যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে। ফলে সেই ঘন পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি দিতে হয়। মার্কিন প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের গবেষণা বলছে, জিপিটি-৩ মডেল দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি লেখা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হয়। এর মধ্যে সরাসরি কুলিংয়ে লাগে প্রায় ২ মিলিলিটার, বাকি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ছবি তৈরির জন্য আলাদা কোনো হিসাব সেখানে নেই, তবে জ্বালানি খরচের ভিত্তিতে অনুমান করা হয় একটি ছবি তৈরিতে গড়ে ২৩ মিলিলিটার পানি লাগে, অন্য কোনো বিশ্লেষণে তা ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার বা তারও বেশি হতে পারে। পার্থক্যটা মূলত হিসাবের পদ্ধতির কারণে—শুধু কুলিংয়ের পানি হিসাব করা হয়, নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পানিও যোগ করা হয়। তুলনামূলকভাবে, একটি সাধারণ গুগল সার্চে মাত্র ০.২ থেকে ০.৬ মিলিলিটার পানি খরচ হয়।

একক হিসাবে এই সংখ্যাগুলো তুচ্ছ মনে হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব বিশাল। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এআই ব্যবহার করছে, ফলে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্যমতে, একটি মাঝারি ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে, যা প্রায় এক হাজার পরিবারের বার্ষিক চাহিদার সমান। বড় ডেটা সেন্টারগুলোতে দিনে ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি লাগতে পারে। পানি শুধু কুলিংয়েই শেষ হয় না; ডেটা সেন্টার চালানোর জন্য যে বিদ্যুৎ লাগে, তার উৎপাদনেও প্রচুর পানি খরচ হয়। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঠান্ডা রাখতেও পানি দরকার হয়, ফলে এআইয়ের বিদ্যুৎ চাহিদা যত বাড়ে, পানির খরচও তত বাড়ে।

এই পানি মূলত সংগ্রহ করা হয় স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে, যার বড় অংশই সুপেয় মিঠাপানি। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন পানি ব্যবহার ও কৃষিতে মারাত্মক চাপ পড়ছে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। সমালোচনার মুখে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প খুঁজছে। মাইক্রোসফট তাদের টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারা টেক্সাস, ওয়াশিংটনের কুইন্সি, ক্যালিফোর্নিয়া ও সিঙ্গাপুরে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার শুরু করেছে। সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় ৯৯ শতাংশ পানি এখন অ-সুপেয় উৎস থেকে আসে। অ্যামাজনের ক্লাউড শাখা এডব্লিউএস ঘোষণা করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টির বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে, যাতে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে। গুগল ও মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে 'ওয়াটার পজিটিভ' হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অর্থাৎ তারা যত পানি খরচ করবে, তার চেয়ে বেশি পানি পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই লক্ষ্য নিয়েছে এবং দাবি করছে, ২০২৫ সালের শেষে তারা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করেছে।

সুপেয় পানির চাপ কমাতে আরেকটি ধারণা হলো সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপন। সমুদ্রের পানি বিনা মূল্যে পাওয়া যায় এবং প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা, তাই এটি আদর্শ সমাধান মনে হচ্ছে। ২০১৮ সালে মাইক্রোসফট স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে 'প্রজেক্ট নেটিক' নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার বসিয়েছিল। দুই বছর পর দেখা যায়, ডাঙার তুলনায় পানির নিচের সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে এগোয়নি; ২০২৪ সালে মাইক্রোসফটের ক্লাউড বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ জানান, তারা আর পানির নিচে ডেটা সেন্টার বানাচ্ছেন না। তবে চীন এ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে, যা সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে অবস্থিত এবং ওজন ১ হাজার ৩০০ টন। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০০টি মডিউল বসানো হলে স্থলভাগের তুলনায় বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে।

সাগরের নিচে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া ভিন্ন—সার্ভারগুলো সিল করা মডিউলের ভেতর থাকে এবং চারপাশের লবণাক্ত পানি কেবল বাইরের আবরণ দিয়ে তাপ শুষে নেয়, পানির সাথে সরাসরি সংস্পর্শ হয় না। এতে মরিচা ধরার ভয় নেই, বাষ্পীভবনও হয় না, কেবল তাপের বিনিময় ঘটে। বিশাল সমুদ্রের তুলনায় যৎসামান্য পানি গরম হয়, যা পরিবেশের ক্ষতি করে না।

তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার ব্যবহার করে না? কারণ বাষ্পীভবনের সময় খনিজ পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং পাইপে স্কেল বা আস্তরণ জমে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়। রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনই পাইপে আস্তরণ জমলে পানির প্রবাহ ব্যাহত হয়। তাই পুরোনো পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি দিতে হয়। এর বিকল্প হিসেবে 'ক্লোজড-লুপ' বা 'ইমারশন কুলিং' পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। ক্লোজড-লুপে পানি বা বিশেষ তরল বদ্ধ পাইপের ভেতর ঘোরে, ফলে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ইমারশন কুলিংয়ে সার্ভার পুরোটা বিদ্যুৎ-অপরিবাহী তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়। এই পদ্ধতিগুলো পানির অপচয় প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে, তবে তখন দেখা দেয় নতুন সমস্যা—তরল ঠান্ডা করতে বিশাল বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি চালাতে হয়, যা প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয়বহুল স্থাপনার খরচও বহন করতে হয়।

প্রযুক্তি মহলে তাই একটি প্রচলিত কথা আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুয়ের মধ্যে একটি পরিবেশবান্ধব ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন প্রকৌশলীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।