বিজ্ঞান কোনো স্থির সত্য নয়, বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ভুল সংশোধনের একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। তবে বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা জিনোম এডিটিংয়ের মতো চরম উৎকর্ষের মাঝেও সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নেচার সাময়িকীর সম্পাদকীয় এবং গবেষক এনচাংউই মুনুংয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিজ্ঞান যখন কেবল দামি জার্নাল এবং জটিল শব্দজালের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজাততন্ত্রই মূলত বিজ্ঞানবিরোধী মনোভাব এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটিয়ে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান বোঝে না বলেই একে সন্দেহ করে, যাকে বলা হয় 'জ্ঞান-ঘাটতি মডেল'। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান বলছে, কেবল তথ্য চাপিয়ে দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা অর্জনের জন্য তিনটি স্তম্ভ অত্যন্ত জরুরি: গবেষণার অর্থায়ন ও প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা, নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করার বিনয় এবং গবেষণায় সাধারণ মানুষকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা। বিশেষ করে কৃষি বায়োটেকনোলজি বা জিনোম এডিটিংয়ের মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও শঙ্কাগুলোকে আমলে না নিলে জন-আস্থা অর্জন করা কঠিন।
বিজ্ঞান-যোগাযোগের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো 'অনিশ্চয়তা'র উপস্থাপন। রাজনীতি বা ধর্মের মতো বিজ্ঞান চূড়ান্ত সত্যের দাবি করে না; বরং নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় মাস্ক বা ভ্যাকসিন নিয়ে নির্দেশনার পরিবর্তনকে অনেকে বিজ্ঞানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছেন, যা আসলে বিজ্ঞানের স্ব-সংশোধনকারী প্রক্রিয়ারই অংশ। এ পি জয়রামনের মতে, বিজ্ঞানের শক্তি তার নিখুঁত ফলাফলে নয়, বরং তার স্বচ্ছ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক প্রক্রিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিজ্ঞানীদের উচিত গবেষণার কতটুকু নিশ্চিত আর কতটুকু অজানা, তা সততার সাথে জনগণের সামনে তুলে ধরা।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ বা 'উন্মুক্ত বিজ্ঞান' (Open Science) এই আস্থার সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে গমফসলের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক গবেষকদের উপাত্ত শেয়ার করার উদাহরণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। তথ্যের গোপনীয়তা বিজ্ঞানকে অনেক সময় করপোরেট বা শক্তিশালী দেশগুলোর স্বার্থে পরিণত করে। কিন্তু উপাত্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলে তা পুনরায় যাচাই করা সম্ভব হয়, ফলে ডেটা ম্যানিপুলেশনের সুযোগ কমে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।
বর্তমান যুগের 'ইনফোডেমিক' বা তথ্য-মহামারির মোকাবিলায় প্রথাগত প্রেস রিলিজ যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানীদের জটিল পরিভাষা ছেড়ে সহজ রূপকের মাধ্যমে কথা বলতে হবে। পাশাপাশি 'সিটিজেন সায়েন্স' বা নাগরিক বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়ে কৃষক, শিক্ষক ও তরুণদের সরাসরি ডেটা সংগ্রহের কাজে যুক্ত করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে। এছাড়া গণমাধ্যম ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়তে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সায়েন্স কমিউনিকেশন ওয়ার্কশপ ও ফেলোশিপের আয়োজন করা প্রয়োজন।
পরিশেষে, বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে নৈতিক সংস্কার অপরিহার্য। রাজনৈতিক এজেন্ডা বা করপোরেট স্বার্থে সত্যকে বাঁকানো কিংবা নিম্নমানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। প্লেজারিজম বা ডেটা ম্যানিপুলেশনের কারণে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিজ্ঞান যদি রাজনীতি ও অনৈতিকতা থেকে মুক্ত হয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপন করতে পারে এবং ভুল স্বীকার করার সাহস দেখায়, তবেই তা মানবকল্যাণের বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানকে কেবল উচ্চমানের পেওয়ালযুক্ত জার্নালে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের মাটির সাথে মিশিয়ে একে একটি যৌথ সম্পদে রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি।




