দীর্ঘদিন ধরেই সংগীতাঙ্গনে একটি নাম বহুল পরিচিত — আরফিন রুমি। এক সময় তাঁর প্রতিদিন ছিল ভীষণ ব্যস্ততায় ভরা। অডিও রিলিজ, চলচ্চিত্রের গান, সুর ও সংগীত পরিচালনা, আবার স্টেজ শো — সব মিলিয়ে যেন সময়ই পেতেন না তিনি। একপর্যায়ে টানা ২৮ দিনে ২৮টি গান তৈরি করে প্রকাশের রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। এরপর হঠাৎ করেই সব যেন থেমে যায়। ধীরে ধীরে কমতে থাকে কাজের পরিমাণ, অনেকটা আড়ালেই চলে যান তিনি। তবে সেই বিরতি এখন আর নেই। নতুন উদ্যমে আবারও পূর্ণ গতিতে ফিরেছেন এই শিল্পী — হাতে রয়েছে একগুচ্ছ নতুন গান, নাটকের টাইটেল গান, সুর-সংগীত, আবহসংগীত এবং স্টেজ শোয়ের ব্যস্ত সূচি।
চলতি বছরের মে মাসে শেষ হয়েছে মোস্তফা কামাল রাজের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘এটা আমাদেরই গল্প’। এই নাটকের টাইটেল গানটি গেয়েই নতুন করে সবার নজর কেড়েছেন রুমি। গানটি প্রকাশের পর সমসাময়িক ও তরুণ শিল্পীদের অনেকেই জানিয়েছেন, এটি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছেও দারুণ পছন্দ হয়েছে। এমন প্রতিক্রিয়া বিরতির পর রুমিকে আরও উৎসাহিত করছে বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। শুধু গান গাওয়া নয়, মোস্তফা কামালের নতুন ধারাবাহিক ‘ফিরে আসার গল্প’-এর টাইটেল গানে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি আবহসংগীতের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, নামের সাথে যেন মিলে যাচ্ছে রুমির এখনকার সময়টা — ‘ফিরে আসার গল্প’।
২০০৫ সালে একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়ে সংগীতজগতে পা রাখেন রুমি। এরপর একে একে গান গেয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন। তবে জনপ্রিয়তার মাঝেই তাঁর জীবনে নেমে আসে নানা পরিবর্তন। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও একাধিক আইনি জটিলতা তাঁকে নানা সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে রাখে। ফলে সংগীতে তাঁর ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে যায়। কিন্তু এই অনুপস্থিতিকে খুব বড় করে দেখতে নারাজ রুমি। তাঁর মতে, শিল্পীকে সব সময় সামনে থাকতে হবে — এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি শাকিব খানের কথাও উল্লেখ করেন।
রুমি বলেন, ‘কাজের ব্যস্ততায় মাঝে একটু ডুব দিতে হয়। যাতে বিরতির পর আবার নতুন করে শুরু করা যায়। আমার সেই অনিয়মিত থাকাটা একরকম নতুন উদ্যমে ফেরার প্রস্তুতিও বলা যেতে পারে।’ তিনি আরও জানান, এই বিরতি তাঁকে অনেক বদলে দিয়েছে। আগে সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো না হলে খারাপ লাগত, এখন অনেক কিছু সহজভাবে মেনে নিতে পারেন। কাজের চাপের সেই পুরোনো ব্যস্ততার সঙ্গে অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ফলে সংগীতকেও এখন তিনি ভিন্ন চোখে দেখেন।
নতুন করে কাজ শুরু করার পর রুমি ইতিমধ্যে ডজনখানেক নতুন গানের কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি চলছে প্রায় ৩০টি গানের ভিডিও প্রজেক্ট, যার কয়েকটি ইতিমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে। একসাথে এত গান প্রকাশ অবশ্য রুমির কাছে নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘আমি আগে নিয়মিতই মাসে পাঁচ-ছয়টি করে গান মুক্তি দিতাম। ২০১৯ সালে তো এমনও হয়েছে, টানা ২৮ দিনে ২৮টা গান তৈরি করে ইউটিউবে মুক্তি দিয়েছি। আমি তো শিল্পী, কেউ যদি জানতে চায়, আমি কী বলব! তাই এভাবেই কাজ করেছি।’
স্টেজ শোয়ের ব্যস্ততাও বাড়ছে তাঁর। অক্টোবর থেকে তা আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের সামনে গান গেয়ে তিনি নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। রুমির ভাষ্যে, ‘শ্রোতার পালস তো আমার বোঝা। মঞ্চে যখন গাইতে যাই, তা টের পাই। কয়েকটি টিকিট শো করেছি। তরুণ-তরুণীরা ছিল। সবাই গানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দারুণ মজা করেছে। এসব আমাকে অনেক বেশি উদ্দীপ্ত করেছে, শ্রোতাদের প্রতি আরও দায়বদ্ধ হতে শেখাচ্ছে।’
ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতেন আরফিন রুমি। মায়ের উৎসাহেই গানের জগতে তাঁর আগমন। হারমোনিয়ামে গান তুলে শেখার সেই সময় থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর টান। ২০০৫ সালে বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল দিয়ে শুরু, ২০০৭ সালে প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ। এরপর থেকে অডিও, চলচ্চিত্রের গান, সুর ও সংগীত পরিচালনা — সব মিলিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তিনি। শুরুর দিকে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে পরিচয়, তাঁর কাছ থেকে কাজ শেখা এবং তাঁর মাধ্যমেই ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সান্নিধ্য রুমির সংগীতচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে নিজের গান গাওয়ার পাশাপাশি সুর ও সংগীত পরিচালনাতেও তিনি তৈরি করেন আলাদা অবস্থান। মেলোডিনির্ভর গান হয়ে ওঠে তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
‘বলো না কোথায় তুমি’, ‘সহেনা যাতনা’, ‘জ্বলে ওঠো বাংলাদেশ’, ‘প্রিয়তমা’, ‘হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ’, ‘চিঠি’, ‘তোমারই পরশে’, ‘খুঁজে খুঁজে’, ‘তুই আর আমি’, ‘তুমি আমার’ — আরফিন রুমির এমন অনেক গান শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর ফিচারিংয়ে ‘এক জীবন’, ‘সোনা বউ’, ‘এর বেশি ভালোবাসা যায় না’ও পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। প্রেম, দেশাত্মবোধক থেকে রিদমিক — বিভিন্ন ধরনের গানেই নিজের পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন এই শিল্পী।




