শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা বা চাকরির অভাবকে সাধারণত বেকারত্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়, তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিপুল সরকারি বিনিয়োগ, অসংখ্য শিক্ষক এবং ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও প্রত্যাশিত জ্ঞান ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল এই সংকটের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের ৫৮.৮৩ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৯ হাজার থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ২৯৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এই পরিসংখ্যান শিক্ষাদানের মান এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হয়ে নিয়োগ পেলেও, তাঁদের পেশাগত দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের শেখানোর সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেবল আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা একজন শিক্ষককে দক্ষ করে তোলে না; বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বিকশিত করা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই একজন শিক্ষকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বেকারত্বের পরিসংখ্যান আরও আশঙ্কাজনক। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫৪ শতাংশ, যা সব স্তরের শিক্ষার মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক বর্তমানে বেকার। এর মূল কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এবং বাস্তব কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে বিশাল ব্যবধান। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের পর বুঝতে পারে তাদের অর্জিত জ্ঞান বর্তমান চাকরির বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই যুগে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি আর কার্যকর নয়। এখন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষকদেরও নিজেদের আপডেট করতে হবে।

এই সংকট নিরসনে পাঁচটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগে শুধু পরীক্ষার ফলের বদলে শিক্ষাদানের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিয়োগের পর নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, মুখস্থ বিদ্যার বদলে গবেষণা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করা। তৃতীয়ত, শ্রমবাজারের চাহিদার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও আসন সংখ্যা পুনর্বিবেচনা করা। চতুর্থত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। পঞ্চমত, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কেবল উপস্থিতি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অগ্রগতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন হবে।

পরিশেষে, কেবল শিক্ষার্থীদের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য আছে। ডিগ্রি প্রদান এবং যোগ্য মানুষ গড়ে তোলার মধ্যে যে পার্থক্য, তা উপলব্ধি করে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবেই একটি প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।