বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেখানে অধিকাংশ সেবার সহজলভ্যতা অনলাইনে নিশ্চিত হয়েছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও এর অধীনস্থ বিজ্ঞান পাঠাগারে বই ফেরত দিতে দেরির কারণে হওয়া সামান্য এক টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হকের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে এই অদ্ভুত নিয়মটি সম্প্রতি সামনে আসে। বই ফেরত দিতে কয়েকদিন দেরি হওয়ায় তাঁর ওপর এক টাকা জরিমানা করা হয়, যা জমা দিতে তাঁকে টিএসসি এলাকার জনতা ব্যাংকে যেতে বলা হয়। তাঁর পোস্টের সাথে যুক্ত জরিমানার ফরমে স্পষ্ট দেখা যায় জরিমানার পরিমাণ মাত্র এক টাকা।
শিক্ষার্থীদের মতে, এক টাকার মতো সামান্য অংকের জন্য ব্যাংকে যাওয়া এবং লাইনে দাঁড়ানো অত্যন্ত বিরক্তিকর ও ভোগান্তির। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সেবা এখন অনলাইনে দেওয়া সম্ভব হলে এই জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াটি কেন ডিজিটাল করা হলো না, তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে বর্তমানে এক টাকার কাগজের নোটের প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে এই প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটে জরিমানার হার নিয়ে অসামঞ্জস্য রয়েছে। ওয়েবসাইটের এক অংশে প্রথম দুই সপ্তাহে ৫০ পয়সা এবং পঞ্চম সপ্তাহ থেকে তিন টাকা জরিমানার কথা বলা থাকলেও, অন্য এক বিধানে প্রতি সপ্তাহের জন্য ২৫ পয়সা জরিমানার উল্লেখ আছে। এছাড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে এই টাকা হিসাব দপ্তরে নগদে জমা দিতে হবে, কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে পাঠানো হচ্ছে। নিয়মাবলির এই বৈপরীত্য নিয়ে ওয়েবসাইটে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি এবং জামানত অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে যাতে তাঁদের ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াতে না হয়। তবে গ্রন্থাগারের এই পুরোনো নিয়মটি তার বাইরে রয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক এই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর আগের একটি নিয়ম যা এখনো চলছে। তিনি জানিয়েছেন, অল্প পরিমাণ জরিমানার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন।
অন্যদিকে, এই ভোগান্তিকে এক ধরণের 'শাস্তি' হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তাঁর দাবি, এই জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বই ফেরত দিতে দেরি করার ব্যাপারে সতর্ক হবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে এই ব্যবস্থাটি পরিবর্তনের সময় এসেছে এবং খুব শীঘ্রই কিউআর (QR) কোড ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে জরিমানা পরিশোধের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।




