ফ্লোরিডার কম করহার ও অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের টানে পশ্চিম উপকূল থেকে ধনকুবেরদের একটি বড় অংশ এখন সেখানে সম্পত্তি কিনছেন। ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটনে প্রস্তাবিত বা কার্যকর হওয়া উচ্চ করব্যবস্থা এড়ানোর চেষ্টায় গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ (সম্পদের পরিমাণ ২৯৫ বিলিয়ন ডলার) ও সের্গেই ব্রিন (২৭৫ বিলিয়ন ডলার)সহ বেশ কয়েকজন অতি-সম্পদশালী ব্যক্তি ইতিমধ্যে এই রাজ্যে বসতি গড়ে তুলছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, পেপ্যাল ও প্যালান্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল, সিটাডেলের প্রতিষ্ঠাতা কেন গ্রিফিন এবং ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন, যারা গত কয়েক বছরে সেখানে সম্পত্তি কিনেছেন বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরিয়ে নিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রস্তাবিত ‘বিলিয়নিয়ার ট্যাক্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির পর রাজ্যে বসবাসকারী ধনকুবেরদের মোট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। প্রায় দুইশত ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তার জন্য প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে রাজ্যের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এটি কার্যকর হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলের ‘ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ’-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন, বিপরীতে ৪১ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। অতি-ধনীদের মধ্যে এই প্রস্তাব ব্যাপকভাবে অপ্রিয়।
ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন গত বছরের শেষ দিকে ১ জানুয়ারির সময়সীমার আগে ক্যালিফোর্নিয়া ত্যাগ করেন। উবারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ট্র্যাভিস কালানিকও টেক্সাসে চলে গেছেন। ফর্চুনের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, পেজের প্রস্থানের ফলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার, ব্রিনের কারণে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার এবং কালানিক ও থিয়েলের সম্পদের ৫ শতাংশ হিসাবে আরও প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার—সব মিলিয়ে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
এই কর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ধনকুবেররা অর্থায়নও করছেন। ব্রিন সম্প্রতি ‘বিল্ডিং আ বেটার ক্যালিফোর্নিয়া’ নামক একটি রাজনৈতিক কমিটিতে আরও ২ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন; জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত তার মোট অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই গোষ্ঠী তিনটি পাল্টা পদক্ষেপের প্রচার করছে, যা ভোটে পাস হলে ধনকুবের কর বাতিল হতে পারে। অন্যদিকে থিয়েল ‘ক্যালিফোর্নিয়া বিজনেস রাউন্ডটেবল’কে ৩০ লাখ ডলার দিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটন রাজ্যের করনীতিও ধনকুবেরদের স্থানান্তরের একটি কারণ। মার্চ মাসে গভর্নর বব ফার্গুসন ১০ লাখ ডলারের বেশি আয়ের ওপর ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হারে একটি নতুন আয়কর আইনে স্বাক্ষর করেন। ‘মিলিয়নিয়ার ট্যাক্স’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার সংগ্রহের পাশাপাশি ডায়াপার ও শিশু যত্নের ওপর কিছু বিক্রয় কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সিয়াটল ছেড়ে যাওয়া বেজোস ও স্টারবাক্সের সাবেক প্রধান নির্বাহী হাওয়ার্ড শুল্টজের (সম্পদের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার) সিদ্ধান্তে এই আইনের ভূমিকা থাকতে পারে।
অন্যদিকে কেন গ্রিফিন ২০২২ সালের জুনে প্রায় তিন দশক পর শিকাগো ছেড়ে সিটাডেলকে মিয়ামিতে সরিয়ে নেন। সে সময় তিনি শহরের অপরাধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর থেকে গ্রিফিন ও সিটাডেল ফ্লোরিডার রিয়েল এস্টেটে বিলিয়নের পর বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
ফ্লোরিডায় কোনো রাজ্য আয়কর ও মূলধন লাভ কর নেই। মিয়ামি নিজেকে উচ্চ-কর শহরের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। ২০২৫ সালে মিয়ামিতে ১ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ৩৬১টি বিলাসবহুল বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা একটি রেকর্ড। যদিও মধ্যম মানের তালিকাভুক্ত বাড়ির দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯৫ হাজার ডলারে নেমেছে, উচ্চমূল্যের বাজারে চাহিদা বাড়ছে। পাঁচ বছর আগে ৫ কোটি ডলারের কোনো বাড়ি বিক্রি হয়নি, কিন্তু ২০২৫ সালে এ ধরনের বিক্রি বাজারের ৭ শতাংশ দখল করেছে।
মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ (সম্পদের পরিমাণ ১৯৬ বিলিয়ন ডলার) ও তার স্ত্রী ড. প্রিসিলা চ্যান মিয়ামি বিচের পশ্চিমে বিস্কেন উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত কৃত্রিম দ্বীপ ‘ইন্ডিয়ান ক্রিক আইল্যান্ড’—যা ‘বিলিয়নিয়ার বাঙ্কার’ নামে পরিচিত—এ ১৭ কোটি ডলারের একটি জলমুখী প্রাসাদ কিনেছেন। ৪১ জন বাসিন্দার এই দ্বীপে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। জাকারবার্গের বাড়ির কাছে বেজোসের নির্মাণাধীন প্রাসাদও রয়েছে।
জেফ বেজোস একই দ্বীপে তিনটি সম্পত্তি কিনেছেন, যার মোট মূল্য ২৩ কোটি ডলারের বেশি। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তিনি পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দুটি জমি ৬ কোটি ৮০ লাখ ও ৭ কোটি ৯০ লাখ ডলারে কিনেন, যা একত্রিত করে বিশাল প্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য পাশে ২০২৪ সালে প্রায় ৯ কোটি ডলারে কেনা একটি ভূমধ্যসাগরীয় ধাঁচের বাড়িতে তিনি বসবাস করেন।
ল্যারি এলিসন চলতি বছরের শুরুতে পাম বিচ কাউন্টির ম্যানালাপানে ১৬ একরের একটি জলমুখী এস্টেটকে তার প্রধান আবাসন হিসেবে নির্ধারণ করেন। ২০২২ সালে ১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারে কেনা এই সম্পত্তি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার-আ-লাগো এস্টেট থেকে ১০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। ফোর্বসের মতে, হাওয়াইয়ের লানাই থেকে ফ্লোরিডায় প্রধান বাসস্থান সরিয়ে ওরাকলের শেয়ার বিক্রি ও লভ্যাংশ সংগ্রহের আগে এই পদক্ষেপ নিয়ে এলিসন আনুমানিক ১০০ কোটি ডলার কর সাশ্রয় করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি ‘ইউ পাম বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ ২৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে কিনে সেখানে তার পছন্দের জাপানি ও পেরুভিয়ান ফিউশন রেস্তোরাঁ ‘নোবু’ স্থাপন করেন। ২০২১ সালে উত্তর পাম বিচে তিনি আরও ৮ কোটি ডলারে একটি জলমুখী সম্পত্তি কিনেছিলেন। ২০২০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা ভ্যালিতে ট্রাম্পের জন্য একটি তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। গত বছরের শুরুতে ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এলিসন তার পাশে দাঁড়িয়ে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও সফটব্যাংকের প্রধান মাসায়োশি সনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোতে ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ‘স্টারগেট’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন।
ল্যারি পেজ সম্প্রতি মিয়ামির কোকোনাট গ্রোভ এলাকায় ১৮ কোটি ডলারের বেশি সম্পত্তি কিনেছেন। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে তিনি পাশাপাশি দুটি বাড়ি ১০ কোটি ১৫ লাখ ও ৭ কোটি ১৯ লাখ ডলারে কেনেন। এর একটিতে ১৩টি শয়নকক্ষ ও ১৫ দশমিক ৫টি স্নানাগার রয়েছে। জানুয়ারিতে একই এলাকায় আরও একটি সম্পত্তি ১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ডলারে কেনেন।
সের্গেই ব্রিন মিয়ামি বিচের কাছে অ্যালিসন আইল্যান্ডে ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে একটি ১০ হাজার বর্গফুটের বাড়ি কিনেছেন। এতে সাতটি শয়নকক্ষ, জলমুখী পুল ও ব্যক্তিগত নৌকা ঘাট রয়েছে। ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাবেষ্টিত এই দ্বীপে ৫০টির কম বাড়ি রয়েছে।
কেন গ্রিফিন ২০২২ সালে কোকোনাট গ্রোভে ১০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের একটি কমপ্লেক্স কিনেছিলেন। গত এক দশকে তিনি পাম বিচ কাউন্টিতে ৪৫ কোটি ডলার ব্যয়ে ৫০ হাজার বর্গফুটের একটি জলমুখী প্রাসাদ নির্মাণ করছেন, যা সম্পন্ন হলে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আবাসন হবে। তার প্রতিষ্ঠান সিটাডেলের জন্য মিয়ামির কেন্দ্রে ৫৪ তলা বিশিষ্ট সদর দপ্তর নির্মাণে আনুমানিক ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে।
পিটার থিয়েল ২০২০ সালে মিয়ামির ভেনিশিয়ান আইল্যান্ডে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে দুটি বাড়ির সমন্বয়ে একটি কমপ্লেক্স কিনেছিলেন। গত বছরের শেষ দিকে থিয়েল ক্যাপিটাল মিয়ামিতে একটি কার্যালয় খুলেছে। ফেব্রুয়ারিতে প্যালান্টিরও সদর দপ্তর মিয়ামিতে স্থানান্তরের ঘোষণা দেয়।
হাওয়ার্ড শুল্টজ ও তার স্ত্রী শেরি শুল্টজ মিয়ামি বিচের উত্তরে সার্ফসাইডে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে একটি পেন্টহাউস কিনেছেন। ৪৪ বছর সিয়াটলে বসবাসের পর তিনি লিঙ্কডইনে এক বিবৃতিতে মিয়ামিতে স্থানান্তরের কথা জানান। ৫ হাজার ৫০০ বর্গফুটের এই সম্পত্তিতে পাঁচটি শয়নকক্ষ, ছাদে বারান্দা ও জলমুখী কেবানা রয়েছে।
অতি-ধনীদের জন্য ফ্লোরিডার জলমুখী বিলাসবহুল আবাসনের চাহিদা ও দাম দুটোই বাড়ছে, যদিও মধ্যম বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে।




