রাজধানীর বর্জ্য পরিষ্কারের দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লার গাড়ি চালনায় এক ভয়াবহ অরাজকতার চিত্র ফুটে উঠেছে। একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নথিতে যাদের নামে গাড়ি বরাদ্দ এবং যারা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, সেই মূল চালকদের বদলে বহিরাগত বা অদক্ষ সহকারীরা গাড়ি চালাচ্ছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চালকদের লাইসেন্স পর্যন্ত নেই, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১১-৪৩০৩ নম্বরের একটি গাড়ি চালাচ্ছিলেন সাজু আহমেদ নামের এক যুবক, যিনি সিটি করপোরেশনের কর্মী নন এবং মাসে ১০ হাজার টাকায় সহকারীর কাজ করেন। গাড়িটি বরাদ্দ ছিল সরদার হুমায়ন কবিরের নামে, কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে হালকা গাড়ির লাইসেন্সধারী সাজু ভারী গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূল চালক তখন আড্ডায় ব্যস্ত ছিলেন। ডিএসসিসির অন্তত ৫৬টি গাড়িতে এমন অনিয়ম চলে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যার মধ্যে ২২টির তথ্য সরাসরি পাওয়া গেছে।

এই গাফিলতির খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬টি পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান, স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ এবং লন্ড্রি কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নির্ধারিত চালকের পরিবর্তে অন্য কেউ গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। নটর ডেমের ছাত্রের মৃত্যুর পর ব্যাপক আন্দোলন ও তদন্তের মাধ্যমে কিছু চালককে বরখাস্ত করা হলেও এই প্রবণতা বন্ধ হয়নি।

অর্থনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রিপ প্রতি বরাদ্দকৃত জ্বালানির পুরো অংশ গাড়িতে না তুলে বাকি অংশ কম দামে পাম্পেই বিক্রি করে দেওয়া হয়। পাম্প কর্মকর্তাদের মতে, এই তেলের টাকা মূল চালকদের নামে জমা থাকে এবং পরে তা ভাগ করে নেওয়া হয়। হিসাব অনুযায়ী, মাসে প্রায় ১৭ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল এভাবে সরানো হতে পারে, যার বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এই অর্থ চালক, ইউনিয়ন নেতা এবং কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ভাগ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদার এই দাবি অস্বীকার করেছেন।

ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, লাইসেন্সবিহীন কাউকে গাড়ি চালাতে না দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সহকারীকে গাড়ি চালাতে দিলে চালক ও তদারককারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামছুল হকের মতে, কেবল চালককে দায়ী না করে সিটি করপোরেশনকে মূল দায় নিতে হবে এবং গাড়ির ফিটনেস ও চালকের বৈধতা নিশ্চিত করে নিজেদের ভেতর থেকে সংস্কার করতে হবে।