মুক্তচিন্তা ও সামাজিক পরিবর্তনের মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিটি জনপদে পাঠাগার গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করল ‘বাংলাদেশ পাঠাগার আন্দোলন’। শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ এবং প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ‘একটাই মন্ত্র জনগণতন্ত্র, একটাই যুক্তি শোষণমুক্তি’—এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা পাঠাগারকে যুক্তিবোধের চর্চাকেন্দ্রে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনকারী অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হবে বর্তমানের নবীন প্রজন্ম। তিনি মনে করেন, সঠিক ইতিহাস জানা এবং মননশীলতা বৃদ্ধিতে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। কেবল মুঠোফোনে ব্যক্তিগতভাবে পড়ার পরিবর্তে সম্মিলিত পাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে চিন্তা ও চেতনা শাণিত করার আহ্বান জানান তিনি। অধ্যাপক আকাশের মতে, গ্রাম, শহর এবং বস্তি—সবখানেই পাঠচক্র গড়ে তুলতে হবে যাতে প্রাপ্ত জ্ঞানকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবর্তনের সংগ্রামে ব্যবহার করা যায়।
অনুষ্ঠানে লেখক ও গবেষক নিতাই দাস বিজ্ঞানমনস্কতা এবং যুক্তিবোধ বাড়িয়ে আধুনিক মানুষ গড়ার কথা বলেন। তিনি সতর্ক করেন যে, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে মানুষ গভীর পাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে যেমন নতুন পাঠাগার স্থাপন প্রয়োজন, তেমনি বিদ্যমান অকেজো পাঠাগারগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করতে হবে। অন্যদিকে, ‘শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদক এ এন রাশেদা মনে করেন, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বই-পুস্তিকায় স্থান পেলে তাদের পড়ার আগ্রহ বাড়বে এবং সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত হবে।
শিশুদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করতে এবং নতুন স্বপ্ন তৈরিতে মায়েদের সচেতন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন লেখক ও অধ্যাপক আবু তাহের খান। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল সংগঠনের মূল লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, তারা দেশের প্রতিটি গ্রামে অর্থাৎ প্রায় ৬৮ হাজার গ্রামে পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি হওয়া আট হাজারেরও বেশি সুপ্ত পাঠাগারকে পুনরায় চালু করার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনের শেষে সর্বসম্মতিক্রমে ৭১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন অধ্যাপক এ এন রাশেদা, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান রিপন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল।
অধ্যক্ষ আকমল হোসেনের সভাপতিত্বে এবং ফেরদৌস আহমেদ উজ্জলের সঞ্চালনায় এই সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স), বাসদের নেতা নিখিল দাস এবং বাংলাদেশ খেতমজুর সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর গণসংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে। সম্মেলন থেকে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।




