বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগের তত্ত্বাবধানে পেট্রোবাংলা এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এই আমদানির দায়িত্ব পালন করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানির প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ১০-১১ মার্কিন ডলার, যা জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বেড়ে ২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত ছয় মাসে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য সরকার বেশ কয়েক দফায় দরপত্র আহ্বান করেছিল। ১৭ আগস্টের দরপত্রে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের (বিপি) করা ২২ ডলারের কম দরের দুটি কার্গো পাওয়া গেলেও বাকিগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র ডাকতে হয়। ১৮ আগস্টের দরপত্রে সৌদি আরামকো ১-২ সেপ্টেম্বরের কার্গোর জন্য ২৪ ডলারের নিচে দর প্রদান করে। ১৯ আগস্টের তৃতীয় দফায় বিপি ২৫.৩১ ডলার দরে ২৬-২৭ আগস্টের কার্গোর জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। তবে ২৯-৩০ আগস্টের কার্গোর দর অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় সরকার তা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসের জন্য নতুন করে আরও তিনটি কার্গোর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে কেনা চারটি কার্গোর আগস্টে আসার কথা থাকলেও একটিও আসেনি। অন্যদিকে, মন্ত্রিসভার ক্রয় কমিটি ২০ থেকে সাড়ে ২১ ডলার দামের তিনটি কার্গোর অনুমোদন দেয়নি। এই সমন্বয়হীনতা ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে সরকারকে এখন অনেক বেশি দামে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট দাম ১ ডলার বাড়লে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৪১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ফলে বর্তমান উচ্চমূল্যের কারণে এক কার্গো আমদানিতেই সরকারের প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।
গ্যাস সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত, কাতারের সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের শীতকালীন চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কার্গো আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দেশি গ্যাস উৎপাদন গত ৯ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সালে আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে মহেশখালের দুটি টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি গত জুলাইয়ের অগ্নিদুর্ঘটনার পর দফায় দফায় বন্ধ হয়েছে। যদিও সম্প্রতি নতুন একটি কার্গো পৌঁছানোর পর সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, তবে নতুন কার্গোর নিশ্চয়তা না থাকায় সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম মনে করেন, বর্তমান চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য সরকারের নেই। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়িয়ে শিল্পক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কৌশলগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।




