ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালার সংস্কারের পর সেখানে স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ছবি সরিয়ে দিয়ে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো ছবি সেখানে স্থান না পেয়ে বরং পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৯৬৬, ১৯৬৯ সালের আন্দোলন, ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং রাজাকারদের তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্মারকগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান প্রথম আলোর ‘বার্তাকক্ষে’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এই পরিবর্তন করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মারকগুলো এখন কোথায় রাখা হয়েছে।

গত রোববার সংগ্রহশালাটি চালু হওয়ার পর জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক শিক্ষার্থী জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা সেখানে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি স্থাপন করেন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এই ঘটনার প্রতিবাদে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে বলেন, এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে এই কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছিল না। তিনি মনে করেন, ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি অংশ এবং তাদের দায়িত্ব প্রশাসনকে সহায়তা করা, কিন্তু প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে কাজ করা বা তাদের চ্যালেঞ্জ করা ডাকসুর এখতিয়ারের বাইরে। সংগ্রহশালার মালিকানা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিন্ডিকেটের বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাশাপাশি, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করার বিষয়েও তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন। তিনি এটিকে 'প্যারালাল প্রশাসন' তৈরির চেষ্টা এবং এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই থাকা উচিত। ডাকসু এই দায়িত্ব নিলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার এবং পক্ষপাতের প্রবল আশঙ্কা থাকে। এছাড়া শিক্ষকদের রেটিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে তিনি 'প্রাইভেসির লঙ্ঘন' এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুস্থ সম্পর্কের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আইবিএ ও আইআর-এর মতো কিছু বিভাগে ইতিমধ্যে শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ চলছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে তৎপর।

পরিশেষে, ডাকসু নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এর গুরুত্ব স্বীকার করলেও অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন সতর্ক করেন যে, ডাকসু যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়, তবে তা জাতীয় রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।