ছোটবেলায় জোনাথন স্প্যানোর একটাই স্বপ্ন ছিল—মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট হওয়া। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। নৌবাহিনীর কঠোর দৃষ্টি মানদণ্ড পূরণ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শৈশবে চশমা পরতে হতো বলে তিনি সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। ফলে অন্য পথ বেছে নেন তিনি। সেই পথই তাকে পৌঁছে দিয়েছে হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা 'টপ গান: ম্যাভরিক'-এর আকাশযুদ্ধ দৃশ্যের স্টান্ট পাইলটের আসনে।
ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্প্যানো বলেন, বিমানের প্রতি তার মুগ্ধতা ছিল ছোটবেলা থেকেই। ঘরের ছাদে মাছ ধরার সুতোয় ঝুলিয়ে দিতেন ছোট ছোট মডেলের বিমান। 'টপ গান' সিনেমা দেখে তিনি মোহিত হয়েছিলেন এবং নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিমানবাহী রণতরীতে উড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝতে পারেন, ভালো দৃষ্টিশক্তির বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ন্যূনতম মান হলো ২০/২০ দৃষ্টি, তার চেয়েও ভালো প্রয়োজন। তার চোখ সেই মান পূরণ করেনি।
তাই নতুন স্বপ্ন গড়েন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার এক শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা স্প্যানো এবং তার ভাই কিশোর বয়সেই ট্রাফিক কন্ট্রোলের কাজ শুরু করেন। বাবার কাজের প্রতিষ্ঠানের জন্য রাস্তায় কন ও বেরিকেড স্থাপন করতেন তারা। অল্প বয়সেই তারা বুঝতে পারেন, এই সেবার চাহিদা রয়েছে। কিন্তু তখন কেউ কেবল বেরিকেড ভাড়া দিত, বসিয়ে দিত না। আবার কেউ পারমিটের ব্যবস্থা করত, কিন্তু অন্যান্য সেবা দিত না। তাই ১৯৯৫ সালে তারা নিজেরাই একটি ব্যবসা শুরু করেন—ভাড়া দেওয়ার সরঞ্জাম, কন, বেরিকেড, সাইন এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি ডিসপ্যাচ পরিষেবা একত্রে।
প্রথমে ঠাকুরমার গ্যারেজে অফিস খোলেন তারা। স্প্যানো বলেন, পরিকল্পনা ছিল না জাতীয় পর্যায়ের কোম্পানি গড়ার। শুধু কিছু টাকা আয়ের চেষ্টা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যবসা বেড়ে যায়। ত্রিশ বছর পরে, সেই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেটেড এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টির বেশি স্থানে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এটি দেশের বৃহত্তম ব্যক্তিমালিকানাধীন ট্রাফিক কন্ট্রোল কোম্পানি এবং দৈনিক আয় ১০ লাখ ডলারের বেশি।
মজার বিষয় হলো, এই ব্যবসাই তার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন পূরণের পথ করে দিয়েছে। অ্যাকাউন্ট্যান্টের পরামর্শে তিনি একটি ছোট বিমান কেনেন—কর ছাড়ের সুবিধা পেতে এবং কোম্পানির বিভিন্ন শাখায় দ্রুত যাতায়াতের জন্য। সেসনা বিমান কিনে উড়তে শেখেন তিনি। পরে আরও বড় ও দ্রুত বিমান কেনেন, অবশেষে ব্যক্তিগত জেট কেনার পর্যায়ে পৌঁছান। এর মধ্যে তার দ্বিতীয় শৈশবের নেশা—চলচ্চিত্র নির্মাণও জড়িয়ে যায়। প্রায় ২০ লাখ ডলারে হেলিকপ্টার কিনে হলিউডের অ্যারিয়াল কোঅর্ডিনেটর ফ্রেড নর্থের সঙ্গে ক্যামেরা রিগ বসান। নর্থই তাকে জানান, নতুন 'টপ গান' সিনেমা বানানো হচ্ছে এবং তিনি যদি নিজের জেটে ক্যামেরা বসাতে পারেন, তবে সেই সিনেমায় কাজ করতে পারবেন।
স্প্যানো প্রায় ১৮ মাস ধরে তার এমব্রায়ার ফেনোম ৩০০ জেটকে ক্যামেরা বহনের উপযোগী করে তোলেন, এফএএ অনুমোদনও নেন। তিনি বলেন, সময়মতো কাজ শেষ করে 'টপ গান: ম্যাভরিক'-এ উড়তে পেরেছিলেন। সিনেমায় জেট-টু-জেট অনেকগুলো দৃশ্যে তিনি অংশ নেন, যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরীর সব দৃশ্য ছিল। এই কাজের জন্য তারা স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড পান।
প্যারামাউন্ট এখন তৃতীয় 'টপ গান' সিনেমা বানানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রযোজনা ২০২৭ সালে শুরু হবে। স্প্যানো পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তার মতে, বিশ্বে এই ধরনের একমাত্র ক্যামেরা জেট তাদের আছে, তাই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আশা তিনি করছেন। এর আগে তিনি নেটজেটস, ফ্লেক্সজেট, গালফস্ট্রিম, ডেল্টাসহ বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের 'আমেরিকা দ্য বিউটিফুল' প্রকল্পেও ছিলেন তিনি, যেখানে আলাস্কার উত্তরাঞ্চলীয় লাইটের আকাশজুড়ে দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। এই কাজের জন্য এমি মনোনয়নও পেয়েছেন তারা।
স্প্যানোর উপদেশ—সাহসী হোন, ঝুঁকি নিন, তবে কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা বজায় রাখুন। তিনি বলেন, পরিবার ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত ১১টায় পড়াশোনা করে সকাল ৬টায় কাজে যেতেন। হাজারো ঘণ্টার প্রশিক্ষণ তাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। লক্ষ্য স্থির করে ভয় না পেয়ে এগিয়ে যাওয়াই তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে তিনি মনে করেন।



