দশক খানেক আগে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেন, তখন তিনি চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, বেইজিং আমেরিকার কলকারখানা ধ্বংস করেছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিয়েছে। তবে বর্তমানে সেই কঠোর সুর বদলে গিয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মানে হোয়াইট হাউসে এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছেন ট্রাম্প। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, “তিনি একজন অত্যন্ত ভদ্র ব্যক্তি; আমাদের সম্পর্ক চমৎকার।”

বিস্ময়করভাবে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শি জিনপিংকে ছাড় দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইরানকে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে সহায়তা করার বিষয়ে চীনের সংশ্লিষ্টতার রিপোর্ট সামনে আসলেও ট্রাম্প সেটিকে গুরুত্ব দেননি। তার মতে, শি জিনপিং ‘যথেষ্ট ভালোভাবে’ আচরণ করেছেন। এমনকি ২০২০ সালে মার্কিন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কথা বললেও, বর্তমানে ট্রাম্প পাল্টা ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, আগের তুলনায় বর্তমান চীন কিছুটা ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই উদারতার পেছনে রয়েছে তার আগের কৌশলগত ব্যর্থতা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র উপদেষ্টা মাইকেল কোভরিগ মনে করেন, উচ্চ শুল্ক এবং রপ্তানি বিধিনিষেধের মাধ্যমে চীনকে চাপে ফেলার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সম্পদের ওপর চীনের একচেটিয়া আধিপত্য ট্রাম্পকে একটি বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছে। ফলে চাপের রাজনীতির বদলে ট্রাম্প এখন আতিথেয়তার পথ বেছে নিয়েছেন। আগামী বছরের আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতেও দুই নেতার আরও কয়েকবার সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে। শি জিনপিংয়ের আগমনে হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে হেলিপ্যাড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং তাদের জন্য বিশেষ বলরুমের আয়োজন করা হয়েছে।

তবে ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পরিচালক এবং জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভান মেডেইরোজ বলেন, যখন প্রতিযোগিতার সব দিক শক্তিশালী করা প্রয়োজন, তখন ট্রাম্প কেবল বাহ্যিক সম্পর্কের চাকচিক্য বা ‘অপটিক্স’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই খামখেয়ালী আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে উপহাস করা, ন্যাটো-র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি—সব মিলিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো এখন বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। কোভরিগের মতে, ট্রাম্প পরোক্ষভাবে শি জিনপিংয়ের ‘ওয়েজ ট্যাকটিকস’ বা বিভাজন কৌশলেই সাহায্য করছেন, যার ফলে অনেক পশ্চিমা নেতা চীনকে আরও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখছেন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চিত্রটি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। যদিও ২০২৫ সালের তুলনায় পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমেছে, তবে চীন এখন ভিয়েতনামের মতো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে মার্কিন শুল্ক এড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। গত বছর ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মাধ্যমে চীন তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। বিশেষ করে কম দামি ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) রপ্তানির মাধ্যমে জার্মানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অটোমোবাইল খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বেইজিং।

প্রযুক্তির লড়াইয়ে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতে ট্রাম্পের লক্ষ্য এখন সর্বোচ্চ গতিতে উন্নয়ন করা। তার মতে, এআই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন, যা সোনা বা তেলের চেয়েও মূল্যবান। তবে এখানেও বিতর্ক রয়েছে। মার্কিন এআই মডেল ব্যবহার করে চীন তাদের প্রযুক্তি উন্নত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তা সত্ত্বেও হোয়াইট হাউসের অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ মনে করেন, চীনকে কেবল ‘খারাপ অভিনেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না, কারণ দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক এবং তারা একসাথে চুক্তি করতে সক্ষম।