দিল্লির ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় এক নাটকীয় মোড় এসেছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে দিল্লির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম এখন নির্বাচন কমিশনের নজরে। ইংরেজি দৈনিক 'দ্য হিন্দু'-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তালিকায় রয়েছেন বর্তমান দিল্লির মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা প্রবেশ বর্মা, যাঁর পিতা প্রয়াত সাহেব সিং বর্মা একদা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তালিকায় কেবল রাজনৈতিক নেতাই নন, বরং সাবেক উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় ও তাঁর স্ত্রী সুদেশ ধনখড়, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন লোকুর, প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিব্বাল ও তাঁর স্ত্রী প্রমীলা সিব্বাল এবং বিজেপি নেতা সুব্রামানিয়ম স্বামীও নির্বাচন কমিশনের নোটিশ পেয়েছেন। এছাড়া বিজেপি নেতা ও দিল্লি প্রদেশ বিজেপির সাবেক সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরাও নথিপত্রে অসংগতির অভিযোগে নোটিশ পেয়েছেন।
বিশেষ করে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পুরো পরিবারই এখন কমিশনের প্রশ্নের মুখে। তাঁর স্ত্রী সুনীতা, পুত্র পুলকিত, পিতা গোবিন্দ রাম ও মাতা গীতা দেবীর নাম ভোটার তালিকা থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে। আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যম 'এক্স'-এ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রীর পুরো পরিবার কীভাবে তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে। নয়াদিল্লির ওই নির্দিষ্ট বুথের মোট ১১০ জন ভোটারকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যেখানে কেজরিওয়াল পরিবারকে 'আনম্যাপড' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তর ক্ষেত্রে 'লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি' বা যুক্তিপূর্ণ অসংগতির কারণ দেখানো হয়েছে। কমিশনের দাবি, তাঁর বয়স এবং বাবা-মায়ের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম। তবে শালিমার বাগের নির্বাচনী আধিকারিক জানিয়েছেন, সরেজমিনে তদন্তের পর মুখ্যমন্ত্রীর নাম বৈধ প্রমাণিত হয়েছে এবং নভেম্বরের চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম থাকবে।
দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অশোক কুমার জানান, খসড়া তালিকায় নাম ও জন্মতারিখের অসংগতির কারণে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে মতামত ও আপত্তিসংক্রান্ত শুনানি চলছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগতভাবে শুনানিতে আসতে হবে না, বরং কর্মকর্তারা বাড়ি গিয়ে নথি যাচাই করবেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন কপিল সিব্বাল। তিনি এই সংশোধন প্রক্রিয়াকে 'ত্রুটিপূর্ণ' ও 'দূষিত' বলে অভিহিত করে একে 'ভোট চুরি'র কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই গণহারে নাম বাদ দেওয়ার প্রভাব থেকে বিচারপতি বা কূটনীতিকরাও রেহাই পাননি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লির প্রায় ৩৩ লাখ ভোটারের কাছে এমন নোটিশ গেছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৪ জন 'লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি' এবং ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮৫ জন 'নন-ম্যাপিং' বিভাগে পড়েছেন।
প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, সেখানেও এসআইআর প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ ভোটার সমস্যায় পড়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আসা আবেদনের মাত্র ২০ শতাংশ গৃহীত হয়েছে, অন্যদিকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনগুলোর ৯০ শতাংশ গ্রহণ করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বৈধ ভোটাররা ভোট দেওয়ার অধিকার হারাচ্ছেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৯৭ শতাংশ আবেদন অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে, যা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতিও সেই দিকেই যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।




