বাঙালির খাদ্যতালিকায় ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম, তবে এই জনপ্রিয়তার সুযোগে বাজারে এখন ব্যাপক প্রতারণা চলছে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁগুলোতে চন্দনা বা সুরমা মাছকে 'চন্দনা ইলিশ' বা 'সুরমা ইলিশ' নামে পরিবেশন করা হচ্ছে। অথচ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে চন্দনা ইলিশের নিকটাত্মীয় হলেও তা আসল ইলিশ নয়, আর সুরমার সঙ্গে ইলিশের কোনো সম্পর্কই নেই।

আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের (Tenualosa ilisha) জীবনচক্র সমুদ্র ও নদীর মধ্যে আবর্তিত হয়। ডিম ছাড়ার জন্য এই মাছ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো নদীতে আসে। এই প্রজাতিটি ২০১৭ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। প্রজনন রক্ষায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ৫৮ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। আমাদের জলসীমায় ইলিশ গোত্রের তিনটি প্রজাতি থাকলেও আমরা মূলত প্রথম প্রজাতিটিকে ইলিশ হিসেবে চিনি।

প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে চন্দনা মাছ। একে ইংরেজিতে 'টোলি শ্যাড' বলা হয়। সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে একে 'চন্দনা ইলিশ' এবং চট্টগ্রামে 'ফুইট্টা ইলিশ' বলা হয়। চন্দনা সাধারণত রুপালি রঙের হয় এবং গায়ের রংয়ে হলদে আভা থাকে। ফুলকার পেছনে অস্পষ্ট কালচে ছাপ এবং ওপরের চোয়ালের মাঝখানে একটি ছোট খাঁজ থাকে। তবে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে কারণ 'Sardinella melanura' নামক সামুদ্রিক মাছকেও অনেকে চন্দনা বা 'কালটিপ তাকিয়া' বলে বিক্রি করেন, যার লেজের ডগায় কালো রং থাকে।

অন্যদিকে, সুরমা মাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্গের। এটি ম্যাকেরেল পরিবারের সদস্য, যার ইংরেজি নাম 'কিং ম্যাকেরেল'। সুরমার দেহ লম্বাটে ও দুই পাশে চাপা, পিঠ নীলচে রুপালি এবং পেটের দিকটি সাদাটে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো শরীরজুড়ে সারি সারি খাড়া কালচে দাগ, যা আসল ইলিশের গায়ে থাকে না। এছাড়া সুরমার চোয়ালে করাতের মতো খাঁজকাটা শক্ত দাঁত থাকে।

ইলিশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই প্রতারণার মূল কারণ। চাঁদপুরের মাছঘাটে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোয় অসাধু ব্যবসায়ীরা সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা বা টাকিয়া মাছকে আসল ইলিশ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। অভিজ্ঞ ক্রেতারা আস্ত মাছ দেখে পার্থক্য বুঝলেও রান্না করা মাছের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হন।

আসল ইলিশ চেনার জন্য কিছু টিপস দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, সম্ভব হলে আস্ত মাছ কেনা উচিত। দ্বিতীয়ত, গায়ের দাগ ও আকার খেয়াল করা জরুরি; মনে রাখতে হবে চন্দনা সাধারণত ইলিশের চেয়ে ছোট হয়, তবে ছোট ইলিশ বা জাটকাকে চন্দনা ভেবে ভুল করা যাবে না। তৃতীয়ত, রেস্তোরাঁয় অস্বাভাবিক কম দামে ইলিশ পাওয়া গেলে সতর্ক হতে হবে। স্থানীয় নামের বদলে বৈজ্ঞানিক নাম ব্যবহার করলে এই বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব, কারণ স্থানীয় নাম অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়। ইলিশের নামে অন্য মাছ বিক্রি করা কেবল অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে প্রতারণা।