বগুড়ার শেরপুরে এক চা ব্যবসায়ীর সাফল্যের গল্প এখন এলাকায় চর্চিত। মাত্র ৩৫ বছর আগে যে পরিবার টিনের বেড়ার ঘরে দিন কাটাত, আজ সেই পরিবারেরই তিনতলা পাকা ভবন। এই বদলের কারিগর মংলা দাস ও তাঁর ছেলে মানিক দাস। সংসারে অভাব দূর করতে ৩৫ বছর আগে ধার করা ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ছোট চায়ের দোকান খুলেছিলেন মংলা দাস (৫৮)। সেই ছোট দোকানই পরে পরিবারের আয়ের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। বাবার দেখানো পথ ধরেই চা ব্যবসায় নেমে পড়েন ছেলে মানিক দাস (৩৮)। বর্তমানে তাঁর ‘মানিক রতন কফি হাউজ’-এ প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি কাপ চা বিক্রি হয়। বৈকাল বাজারের পাশে তাঁদের বাড়ির নিচেই দোকানটির অবস্থান। সকাল আটটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে চা-কফির বেচাকেনা। পাঁচ টাকার সাধারণ লাল চা থেকে শুরু করে ৬০ টাকা দামের বিশেষ চা পর্যন্ত রয়েছে এখানে। লাল চা, দুধ চা, কফি ও মালাই চায়ের পাশাপাশি দুধের সর দিয়ে তৈরি হয় নানা রকম মিষ্টান্ন। অর্থের অভাবে মানিক দাসের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ছোটবেলা থেকেই বাবার দোকানে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। সেখানেই তিনি শিখেছেন চা তৈরির কৌশল, ক্রেতাদের পছন্দ এবং ব্যবসার খুঁটিনাটি। পরে বাবার কাছ থেকে দোকানের দায়িত্ব নিয়ে পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে ব্যবসাকে বড় করে তুলেছেন। শেরপুর শহর ছাড়িয়ে আশপাশের দশমাইল, গাড়িদহ, সেরুয়া, মির্জাপুর, সীমাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তাঁর দোকানে চা পান করতে আসেন। এমনকি ধুনট উপজেলার দূরবর্তী এলাকার অনেকে বিশেষ মালাই চায়ের স্বাদ নিতে ছুটে আসেন। সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরাও ফ্লাস্কে করে দুধ চা নিয়ে যান। শনিবার বিকেলে দোকানে দেখা যায়, কিচেন মার্কেটের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে রাখা চেয়ার ও বেঞ্চে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। কেউ চা পান করছেন, কেউ আড্ডায় মগ্ন। কলেজপড়ুয়া তরুণীদেরও দেখা যায় সেখানে। তাঁদের একজন জানান, মানিকের মালাই চায়ের স্বাদ ভালো, তাই বান্ধবীদের নিয়ে মাঝেমধ্যে এখানে আসেন। শেরপুরের পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থার সভাপতি সোহাগ রায় বলেন, দোকানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং চা পরিবেশনের কাপও পরিচ্ছন্ন। তাই শেরপুরে এলেই তিনি এখানে এক কাপ চা পান করেন। মানিক দাস জানান, প্রতিদিন এক থেকে দেড় মণ দুধের চা বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে গড়ে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কাপ চা প্রতিদিন বিক্রি হয়। দোকানে কাজ করেন চারজন কর্মচারী। ধর্মীয় উৎসব ও সরকারি ছুটির দিনে বেচাকেনা আরও বেড়ে যায়। তাঁর দোকানের বিশেষ আকর্ষণ মালাই চা, যার স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন। মানিক দাস বলেন, বাবার কাছ থেকেই চা বানানো শিখেছেন এবং ছোটবেলা থেকে দোকানে কাজ করেছেন। এখন এই ব্যবসাই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। চা বিক্রির আয় থেকেই গড়ে উঠেছে মানিকদের তিনতলা বাড়িটি। মংলা দাসের চোখে এখন সন্তুষ্টির ছাপ। তিনি জানান, একসময় টিনের বেড়ার বাড়িতে থাকতেন, এখন ছেলেরা ব্যবসা করে তিনতলা বাড়ি করেছে। বাড়ি করতে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, সবই চা বিক্রির আয় থেকে। মংলা দাসের দুই ছেলে মানিক ও রতন অর্থের অভাবে বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, তবে জীবন থেমে থাকেনি। মানিকের চায়ের দোকানের পাশেই ছোট ভাই রতন বেকারির ব্যবসা করেন। সংসার চালানোর পাশাপাশি তাঁরা সঞ্চয়ও করছেন। মানিকের একমাত্র ছেলে সীমান্ত দাসকে তিনি ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন। মংলা দাসের হাত ধরেই আরও কয়েকজন শিখেছেন কাজ এবং গড়ে তুলেছেন নিজেদের জীবিকা। তাঁর দোকানে কাজ করা কর্মচারী দুলাল দাস, কমল দাস ও ভজন দাস তাঁর কাছ থেকে চা তৈরির কাজ শিখে পরে তাঁর সহযোগিতায় আলাদা দোকান খুলেছেন। এখন তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ছোট একটি চায়ের দোকান থেকে শুরু হওয়া পথচলা এক পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছে, পাশাপাশি তৈরি করেছে আরও কয়েকজনের জীবিকার সুযোগ।