ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ১০ শয্যাবিশিষ্ট পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রায় চার একর জমির উপর অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এই কেন্দ্রটির চিত্র অত্যন্ত শোচনীয়। পুরোনো ভবনটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত থাকলেও নতুন ভবনে অস্ত্রোপচার কক্ষসহ মোট ১৯টি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেই ১৯টি কক্ষের মধ্যে ১৭টিই পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। চারপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা, চিকিৎসার কোনো পরিবেশই নেই বললেই চলে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে মোট পদ রয়েছে ২৪টি। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ দুইটি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ চারটি, সহ-সেবকের পদ চারটি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) একটি, ফার্মাসিস্ট একটি, অফিস সহায়ক চারটি, ওয়ার্ড বয় দুইটি, কুক মশালচি দুইটি, নিরাপত্তা প্রহরী দুইটি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী দুইটি। তবে বাস্তবে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন — নিরাপত্তা প্রহরী কামাল উদ্দিন। বাকি ২৩টি পদই শূন্য। কাগজে-কলমে পাঁচজনকে কর্মরত দেখানো হলেও তারা কেউই এখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না।

গত ১ জুলাই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ নার্স লাকি আক্তার (২৮) মারা যান। ওয়ার্ড বয় ও কুক মশালচিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করেন। ফলে এখানে চিকিৎসা সেবা প্রায় বন্ধই। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আসেন চিকিৎসা কর্মকর্তা সাইদুল মোস্তফা। তিনি রোগীদের দেখেন এবং ওষুধ লিখে দেন। সেই ওষুধ রোগীদের হাতে তুলে দেন নিরাপত্তা প্রহরী কামাল উদ্দিন। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) রমজান আলী খানকে অস্থায়ীভাবে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসছিল। গুনিয়াউক ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ছাড়াও আশপাশের চাপরতলা, হরিপুর, পূর্বভাগ ইউনিয়ন এবং হবিগঞ্জের মাধবপুরের বুল্লা ইউনিয়নের বাসিন্দারাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসতেন। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বি এম ফরহাদ হোসেন এই এলাকার প্রতিনিধি ছিলেন। তার সময়ে এখানে চিকিৎসক-নার্স সবই ছিল, রোগীও ভর্তি থাকত। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হওয়ার পর তিন বছর ধরে কেন্দ্রটিতে কোনো চিকিৎসক নেই।

গুনিয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল মালেক বলেন, আড়াই থেকে তিন বছর আগে এখানে নিয়মিত চিকিৎসক থাকতেন এবং দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ রোগী আসতেন। এখন সেই অবস্থা নেই। সপ্তাহে দুই দিন ডাক্তার আসেন, বাকি পাঁচ দিন মানুষ ফিরে যান কোনো সেবা না পেয়ে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা। চিকিৎসার কোনো পরিবেশই নেই বললে ভুল হবে না।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা রোগী মমতাজ বেগম জানান, প্রায়ই মাথাব্যথা ও হাত-পা জ্বালাপোড়ায় ভোগেন। তিন দিন ধরে চিকিৎসকের জন্য এসেছেন, আজ এসে ডাক্তার পেয়েছেন। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিয়েছেন এবং ভালো হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।

নিরাপত্তা প্রহরী কামাল উদ্দিন বলেন, ২০১৪ সাল থেকে তিনি এখানে আছেন। এত দিন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। গত দুই মাস ধরে সপ্তাহে দুই দিন চিকিৎসক আসছেন, তাই রোগীও তেমন আসে না। বর্তমানে এখানে কর্মরত তিনি ছাড়া আর কেউ নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অদিতি রায় জানান, জনবল সংকট নিরসনে প্রতি মাসেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। নতুন নিয়োগ হলে চিকিৎসক-নার্স পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি। তখন ১০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি রাখাও সম্ভব হবে। তবে ততদিন পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।