ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-কে অনেকেই ‘বিসিবির ছায়া’ বলে থাকেন। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনের বিরুদ্ধে বিসিবি সভাপতির ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি বিসিবি কার্যালয়ে নিজের দপ্তরে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব অভিযোগের জবাব দিয়েছেন তিনি। গত ৪ সেপ্টেম্বর কোয়াবের নতুন কমিটির এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়টাকে তিনি কঠিন বলেছেন। নানা ধরনের হুমকির কথাও জানান তিনি। নির্বাচনের আগে থেকে বিভিন্ন অচেনা নম্বর থেকে হুমকি আসতে থাকে। বিপিএল চলাকালে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে কারা এসব করেছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কোয়াব প্রায়ই নেতিবাচক কারণে আলোচনায় আসছে। এর কারণ হিসেবে মিঠুন বলেন, নির্বাচনের সময় দেশে অস্থিরতা ছিল। অনেকেই তখন তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তবে সংগঠন সব সময় খেলোয়াড়কেন্দ্রিক কাজ করেছে। এক বছরে তারা শূন্য থেকে শুরু করেছে। কোয়াবের তহবিলে কোনো টাকা ছিল না। নিজেদের অর্থ ও মানুষের সাহায্যে কার্যক্রম চালিয়েছেন। ঢাকার এক সাবেক খেলোয়াড় ও সিলেটের এক গ্রাউন্ডসম্যানের চিকিৎসায় সহায়তা করেছেন। পাঁচ সন্তানের জনক এক সাবেক ক্রিকেটারের খরচও বহন করেছেন। খেলোয়াড়দের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করেছে কোয়াব। বিসিবির দায়িত্বশীল ব্যক্তির ক্রিকেটারদের গালিগালাজের প্রতিবাদে বিপিএলে ম্যাচ বয়কটের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের বেতন, ম্যাচ ফি ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন মিঠুন। এখন ১৫০ জনের মতো ক্রিকেটার সব ম্যাচ খেললে বছরে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারবেন। বাংলাদেশ দল গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেনি। সেখানে কোয়াবের ভূমিকা প্রসঙ্গে মিঠুন বলেন, সব খেলোয়াড়ের মতামত নেওয়া হয়েছিল। দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখা হয়েছে। তবে ক্রিকেটের স্বার্থে বিশ্বকাপ মিস না করার চেষ্টা ছিল।

কোয়াব বিসিবি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে—এই অভিযোগের জবাবে মিঠুন বলেন, বিসিবির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলে কিছু অর্জন সম্ভব নয়। বিসিবির ভালো কাজে সমর্থন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ দুটোই করা হয়। ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ) ও আইসিসির সম্পর্কের উদাহরণ দেন তিনি। সেখানে নীরব যুদ্ধ থাকে, কিন্তু সমাধান টেবিলে বসে হয়। তিনি আরও বলেন, কোয়াবের সভাপতি হতে বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শত্রুতা থাকার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ থাকলে সেটিও স্বাগত। তিনি জানান, সভাপতি পদে প্রথম পছন্দ ছিলেন না। মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও আকবর আলীকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা দায়িত্ব নিতে চাননি।

বিপিএল এবার আয়োজন করছে না বিসিবি। এতে অনেক ক্রিকেটার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। কোয়াব কেন প্রতিবাদ করেনি—এ প্রসঙ্গে মিঠুন বলেন, তারা বিপিএল না করার প্রস্তাব একবাক্যে মেনে নেয়নি। আলোচনায় খেলোয়াড়েরাও মত দেন যে যেভাবে বিপিএল হচ্ছে, তা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তারা পরিচ্ছন্ন বিপিএল চান। পরে বিসিবি জানায়, এ বছর সম্ভব নয়। তখন বিকল্প হিসেবে এনসিএলের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়। সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পাবেন শীর্ষ ক্যাটাগরির খেলোয়াড়রা, সর্বনিম্ন দেড় লাখ। তবে এটি শুধু এ বছরের জন্য। আগামী বছর বিপিএল হলে ম্যাচ ফি আবার কমে যাবে। তারা স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলেন বলেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বেতন বাড়ানোর আলোচনা হয়। মিঠুনের মতে, বেশির ভাগ ক্রিকেটারের লাভ হয়েছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের আত্মত্যাগের প্রশংসাও করেন তিনি।

২০২৪ সালে ফারুক আহমেদ বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রিকেটারদের চাপে বিপিএল আয়োজন হয়েছিল, যা ছিল অগোছালো। ওই জোর করা ভুল ছিল কি না—এ প্রশ্নে মিঠুন বলেন, তখন বিকল্প সমাধান দেওয়া হয়নি। এবার বোর্ড যখন পারব না বলে জানায়, তখন তারা সুবিধা নিয়ে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।

প্রিমিয়ার লিগে ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েস’ পদ্ধতিতে দলবদলের আলোচনা চলছে। এ ব্যাপারে কোয়াব এখনো কিছু জানায়নি। তবে খেলোয়াড়দের মতামত নেওয়া হয়েছে। গত দুই বছরে অনেক দল ৫০ লাখ টাকাও খরচ করেনি দল গঠনে। খেলোয়াড়েরা আগে ১০-১৫ লাখ টাকা পেত, এখন ৩-৫ লাখ টাকায় খেলছে। তাই শর্তসাপেক্ষে তারা এ পদ্ধতিতে সম্মতি দিতে পারে। টাকার অঙ্ক বাস্তবসম্মত হতে হবে।

ডব্লিউসিএ-র সঙ্গে সম্পর্ক খুবই ভালো বলে জানান মিঠুন। ভারত ছাড়া বিশ্বের সব দলের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের সঙ্গে ডব্লিউসিএ-র চুক্তি আছে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়রা ইমেজ রাইটস হিসেবে অর্থ পায়। প্যাট কামিন্স বিশ্বকাপে ৪০ হাজার ডলার পেয়েছেন। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা আগে পেত না, কারণ চুক্তি স্বাক্ষরিত ছিল না। এবার অস্ট্রেলিয়া সফরে সব খেলোয়াড় চুক্তি সই করেছে। ফলে নারী-পুরুষ সবাই এখন বড় ইভেন্ট থেকে অর্থ পাবেন। সম্প্রতি ম্যাকাইতে ডব্লিউসিএ পাঁচ ক্রিকেটারকে সাইনিং প্রোগ্রামে নিয়েছিল, যেখানে প্রত্যেকে ১০ হাজার ডলার পেয়েছেন।