বিশ্বজুড়ে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে ২৬ সেপ্টেম্বর 'বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস' পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো— 'কোনো বাধা নয়, কেবলই পছন্দ: এখনই নিশ্চিত হোক গর্ভনিরোধক পণ্যের সহজলভ্যতা'। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রায় অর্ধেক গর্ভধারণই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে, যার প্রধান কারণ হলো সঠিক তথ্যের অভাব এবং আধুনিক নিরোধক পদ্ধতির অপ্রতুলতা। বিশেষজ্ঞগণের মতে, পরিকল্পিত পরিবার কেবল নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয় না, বরং শিশুর সঠিক বিকাশ এবং পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ট্যাবুর কারণে একসময় বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। তবে গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, উঠান বৈঠক এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে কুসংস্কার কাটিয়ে পরিবার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চে একটি সফল দৃষ্টান্ত। দেশের এই যাত্রায় ১৯৭৪ সালে ইউএসএআইডি ও সরকারি সহযোগিতায় শুরু হওয়া ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং সোশ্যাল মার্কেটিং প্রজেক্ট’ (বর্তমান এসএমসি) এবং ১৯৭৭ সালে আইসিডিডিআরবি-র ‘মতলব প্রজেক্ট’ মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়ার এই মডেলটি পরবর্তীকালে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার (সিপিআর) যেখানে ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস ২০২২) অনুযায়ী, দেশে সার্বিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ, যার মধ্যে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহারকারী ৫৫ শতাংশ। জনপ্রিয়তার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে খাওয়ার বড়ি (৩৩%), এরপর যথাক্রমে ইনজেকশন (১১%), পুরুষ কনডম (৭%), দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতি (৮%) এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি (৯%)। বর্তমানে দেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২.১৭-এ নেমে এসেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ শতাংশে। শিশুদের মৌলিক টিকাদানের হার ৭৮.২ শতাংশ।
সাফল্যের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগজনক চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। ২০২৩ সালের তথ্যমতে, গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার কমে ৬২.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা এখনো ১২ শতাংশ। বিশেষ করে ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই অপূর্ণ চাহিদা ১২.৭ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। এছাড়া বাল্যবিবাহের হার ৪১.৬ শতাংশ এবং সঠিক কাউন্সেলিং ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী পদ্ধতি মাঝপথে ছেড়ে দিচ্ছেন। মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শহরে প্রাক-প্রসব সেবা (এএনসি ৪+) গ্রহণের হার ৭৭.৪০ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৫২.১০ শতাংশ। এছাড়া সিজারিয়ান প্রসবের হার বেড়ে ৫০.৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং নবজাতকের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ২০ থেকে বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ সবচেয়ে পিছিয়ে থাকলেও রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে সাফল্যের হার সবচেয়ে বেশি।
এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সরকার ‘জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫–৩০’ প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ শূন্যে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনে সঠিক কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা, স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতির বদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির প্রসার ঘটানো, পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বাল্যবিবাহ রোধে তরুণ প্রজন্মের প্রজননশিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগ ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রচেষ্টায় একটি টেকসই ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।




