বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)-এর সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। সম্প্রতি সংগঠনের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেখানে ছিল মাত্র ৬৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩৭০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে তৈরি পোশাক খাতের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি হলেও, এখন তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতগুলোতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু গুরুতর প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে জ্বালানি এবং অবকাঠামোগত সমস্যাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আগামী দুই বছর জ্বালানি নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয় বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে তারা সাহস পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার যদি সুনির্দিষ্ট মাইলস্টোনসহ একটি স্পষ্ট জ্বালানি পথনকশা প্রকাশ করে, তবে বিনিয়োগকারীরা পুনরায় উৎসাহিত হবেন এবং কারখানার নির্মাণকাজ শুরু করতে পারবেন।
প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। যদিও করপোরেট করের পাঁচ বছরের পথনকশা এবং ডিরেগুলেশনের কথা বলা হয়েছে, যা ইতিবাচক; তবে বাস্তব ক্ষেত্রে ডিরেগুলেশনের দৃশ্যমান উদ্যোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয় বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কম শুল্কের সুবিধা পাচ্ছে, যা একটি বড় সুরক্ষাবলয়। এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লাইফ সায়েন্স এবং বৃহৎ উৎপাদনশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বড় বিনিয়োগ আনা সম্ভব। এছাড়া বিডা, বেজা এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন, যদিও হাইটেক পার্ককে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাকে প্রাথমিক পর্যায়ের বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, আর্থিক লেনদেনের প্রায় ৭২ শতাংশ এখনও নগদে হয়। ক্যাশলেস সমাজ গড়তে শুধু 'বাংলা কিউআর' নয়, বরং কার্ড ও এমএফএস-এর সমন্বিত ইকোসিস্টেম প্রয়োজন। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্বের সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি, কারণ তথ্য চুরি বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অ্যামচেমের তিন দশকের পথচলা回顾 করে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য বহুগুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লজিস্টিকস, এভিয়েশন এবং হসপিটালিটি খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগামী সাড়ে চার বছরের জন্য অ্যামচেমের লক্ষ্য হলো আরও ৫ বিলিয়ন ডলার নতুন মার্কিন বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এনবিআর ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান।




