যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তির প্রস্তাব বা অফার লেটার প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেদের স্পনসর লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি এড়াতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) সম্প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য সীমা কমিয়ে এনেছে। আগে এই হার ছিল ১০ শতাংশের নিচে, যা এখন কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ভিসা পাওয়া শিক্ষার্থীদের কোর্সে ভর্তি হওয়ার ন্যূনতম হার ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯৫ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের জুন থেকে কোর্স সম্পন্ন করার ন্যূনতম হার ৮৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই নতুন 'বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট' নীতিমালার অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেড, অ্যাম্বার ও গ্রিন—এই তিন ভাগে মূল্যায়ন করা হবে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গুরুতর ত্রুটির ক্ষেত্রে তাদের স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার সর্বোচ্চ ৪০.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এই হার ৭.১ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ২৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২.৭ শতাংশ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে সব দেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের সম্মিলিত হার ২.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০.৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রভাব কতটা গুরুতর, তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে অন্তত ৪২টি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ চালু হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি প্রতিষ্ঠানে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০টি প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ওপর পৃথক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন, ডি মন্টফোর্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, কিল ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড। আবার সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ, অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি, কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটন, ক্যান্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন এবং ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার।
এই পরিস্থিতির ফলে শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ারের ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুয়্যার নিশ্চিত করেছেন যে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছু দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন। উচ্চশিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'গ্লোবাল অ্যাডমিশন'-এর মতে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ইউকেভিআই থেকে সাক্ষাৎকারের ডাক পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনরায় আবেদন মূল্যায়ন করে স্পনসরশিপ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ইনটেকে কয়েকশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ভর্তির এই কড়াকড়ির পাশাপাশি টিউশন ফি বৃদ্ধি, পাউন্ডের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস এবং আবাসন ও ভিসার অতিরিক্ত খরচ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেকে এখন যুক্তরাজ্যের বিকল্প হিসেবে অন্য দেশ বেছে নিচ্ছেন। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও অভিবাসন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সতর্কভাবে শিক্ষার্থী নির্বাচন করতে হবে।




