মাসের শেষ দিকে বেতনের বার্তা দেখে রাকিবের (ছদ্মনাম) মন ভালো হলো না। তিন বছর ধরে তার বেতন প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে—যোগদানের সময় ছিল ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা, এখন ৬০ হাজার। কিন্তু এই সময়ে বাসাভাড়া, নিত্যপণ্য এমনকি প্রতিদিনের কফির দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বন্ধুরা তাকে চাকরি বদলের পরামর্শ দেন, কিন্তু তিনি ভাবেন, নতুন জায়গায় গেলেই কি বেতন এক লাখ হবে? আসল প্রশ্ন হলো নিজের বাজারমূল্যকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া।
ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ শো ডিওয়ান ফোর্বসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলেছেন, শুধু সময় গুনে বা কঠোর পরিশ্রম করে বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে নির্ভরযোগ্য এবং প্রত্যক্ষ ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে প্রমাণ করতে হয়। অর্থাৎ, বসকে গিয়ে 'সারা দিন কাজ করি' বলার বদলে তথ্য দিয়ে বলা উচিত—'গত এক বছরে আমার কাজের কারণে প্রতিষ্ঠানের এত টাকা সাশ্রয় হয়েছে বা রাজস্ব বেড়েছে।' ভালো কর্মী হওয়া আর বেশি বেতন পাওয়া এক বিষয় নয়; সময়মতো অফিসে আসা, কাজ করা, বসের কথা মানা—এসব প্রশংসনীয়, তবে প্রতিষ্ঠান কেন আপনাকে অন্যদের চেয়ে বেশি দেবে তা দেখাতে হবে।
নিজের পদের বাজারদর না জেনে বেতন বৃদ্ধির কথা বলা অন্ধকারে ঢিল মারার মতো। হার্ভার্ড ল স্কুলের 'প্রোগ্রাম অন নেগোশিয়েশন'-এর ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেতন আলোচনার আগে বাজারের প্রচলিত তথ্য, নিজের অবদান এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। সেখানে ব্যক্তিগত খরচের কথা না তুলে কাজের মূল্য তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেমন বলা উচিত—'স্যার, গত এক বছরে আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছি, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স এত শতাংশ বেড়েছে।'
দক্ষতার তালিকা করলে দেখা যায়, তিন বছর ধরে একই কাজ করলে নতুন কিছু শেখা হয়নি। লিংকডইনের ২৪ লাখ কর্মীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষায়িত দক্ষতা বেশি বেতনের পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বহুবিধ দক্ষতার বিকাশ নতুন পেশায় প্রবেশও সহজ করে। তাই প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন নতুন কাজ শিখতে হবে—বিপণন খাতে ডেটা অ্যানালিটিকস, হিসাব শাখায় আধুনিক ফাইন্যান্সিয়াল সফটওয়্যার, লেখালেখির ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার। এই বিশেষ দক্ষতাই সহকর্মীদের থেকে আলাদা করবে।
বেতন নিয়ে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে তা সহজ। হার্ভার্ডের 'প্রোগ্রাম অন নেগোশিয়েশন'-এর জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু মূল টাকা নয়, নতুন দায়িত্ব, পদোন্নতির রূপরেখা এবং কাজের নমনীয়তাও আলোচনায় যুক্ত করা যায়। ফোর্বসের এপ্রিল ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে মাত্র ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ নতুন কর্মী বেতন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, আর তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ভালো প্রস্তাব পেয়েছেন।
চাকরি বদল বেতন বাড়ানোর শেষ অস্ত্র হতে পারে, তবে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন প্রতিষ্ঠানে শেখার সুযোগ এবং এক বছর পর বাজারমূল্য কত বাড়বে—তা ভেবে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণদের উচিত আগামী ছয় মাসে একটি দামি দক্ষতা অর্জন করা, নিজের কাজের প্রভাবের একটি ফাইল তৈরি করা এবং বাজারের তথ্য জেনে খোলামেলা আলোচনা করা। বেতন বাড়াতে সব সময় চাকরি বদলাতে হয় না; নিজের কাজের দাম বাড়াতে পারলে একই অফিসে বেতন বাড়ানো সম্ভব। শেষ হিসাবটি সহজ—আপনি যত বেশি মূল্যবান হবেন, বেতন বাড়ানোর কারণও তত যৌক্তিক হবে।




