ফ্রান্সে বেতন বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কারের দাবিতে এক বিশাল গণবিক্ষোভ ও দেশব্যাপী ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে বিভিন্ন শহরের রাজপথে প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ ভিড় করেন। সেপ্টেম্বর মাস থেকে দেশটিতে যে অসন্তোষের সূচনা হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে এটিই ছিল এখন পর্যন্ত একদিনের সবচেয়ে বড় জমায়েত। গত ১৭ অক্টোবরের সহিংস ঘটনার রেশ থাকলেও এবারের কর্মসূচিটি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল, যদিও কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
এই ধর্মঘটের ফলে দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সরকারি তথ্যানুযায়ী, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কার্যক্রম বন্ধ থাকে এবং স্কুলকর্মীদের প্রায় ১৩ শতাংশ ধর্মঘটে অংশ নেন। তবে স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাব ছিল সীমিত; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী ধর্মঘটে যোগ দেওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবায় বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি থেকে, তবে পরবর্তীতে এতে বড় ট্রেড ইউনিয়ন এবং আট বছর আগে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা যোগ দিলে এটি একটি সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষক, চিকিৎসক, ডাককর্মী, ফার্মাসিস্ট এবং পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী বড় ইউনিয়নগুলো এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লিওঁ, রেন, নান্তেস এবং মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে উগ্র বামপন্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়, যার ফলে দেশজুড়ে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে। লিওঁতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের তাড়াতে কাঁদুন গ্যাস ব্যবহার করে। রেন শহরে একটি হোটেলে ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানান, তুলুজের কাছে একটি স্কুলে আগুন দেওয়ার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দমকল বাহিনী দেশজুড়ে মোট ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ তা অস্বীকার করে বলেন, পুলিশ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
বিক্ষোভকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবিগুলো ভিন্ন ভিন্ন। সিজিটি-র মতো বড় ইউনিয়নগুলো ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানালে, সিএফডিটি ইউনিয়ন মাসিক বেতন ১০০ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলেছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষা বাজেটে এক হাজার কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আড়াই লাখ নতুন আসন বাড়ানোর দাবি তুলেছে। তবে কট্টর ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীদের দাবি সবচেয়ে কঠোর; তারা প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও তার সরকারের পদত্যাগ এবং নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সূচনা চেয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দাবিগুলো পূরণ করা সহজ হবে না, তাই আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদে চলার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্দোলনকারীরা বড়দিন এমনকি আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই অসন্তোষ কেবল ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ নেই, বরং স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও বড় ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। সমালোচনার মুখে পড়া প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে, সরকার তরুণদের কথা শুনেছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা জরুরি।




